পীরের খলিফা থেকে ‘ভণ্ড’ কবিরাজ

মাসুদ আলম, কুমিল্লা
০১ এপ্রিল ২০১৮, ২৩:০৪আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৮, ০৮:৪৮

কবিরাজ মাহবুবুর রহমান কুমিল্লায় কবিরাজি চিকিৎসায় শেখ ফরিদ নামের এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠার পর থেকে পলাতক রয়েছেন ‘ভণ্ড কবিরাজ’ মাহবুবুর রহমান। অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাত করেই তিনি নির্বিঘ্নে কবিরাজি চিকিৎসা চালাতেন।

শনিবার (৩১ মার্চ) মারা যাওয়া শিশু শেখ ফরিদের বাড়ি বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি (ঝুমুর সংলগ্ন)। সে সিন্দুরিয়া পাড়া গ্রামের প্রবাসী জামাল হোসেনের একমাত্র সন্তান।

এই প্রসঙ্গে কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মজিবুর রহমান বলেন, ‘এই বিষয়ে আমাদের কাছে কোনও অভিযোগ নেই। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবো।’ তিনি গণমাধ্যমে এই সংক্রান্ত খবর দেখেছেন বলে জানান।

কবিরাজের আস্তানার নাম ‘হিযবুল্লাহ জামে মসজিদ’। আস্তানাটি কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের কুচাইতলী বারপাড়ায়। পুলিশের হাতে আটক তার খাদেমের বাড়ি নগরীর মোগোলটুলি এলাকায়।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য শাহাজাহান বলেন, ‘আমি এলাকার জনপ্রতিনিধি। শুধু জানতাম, কবিরাজ মানুষকে তাবিজ দিয়ে থাকেন। তিনি যে জ্বীন বা আধ্যাত্মিক চিকিৎসা দিয়ে থাকেন, সেটা আমি জানতাম না।’

মূল সড়ক থেকে ওই কবিরাজের বাড়িতে যেতে কোনও রাস্তা নেই। ফসলি জমি দিয়ে হেঁটে যাওয়া-আসা করেন তারা। জমি কিনে বাড়ি করার পরই চারপাশে দেয়াল তুলেছেন কবিরাজ মাহবুব। সব সময় বাড়ির গেটে তালা দেওয়া থাকে। অনুমতি ছাড়া কেউ ওই বাড়িতে প্রবেশ করতে পারেন না।

আরও পড়ুন: ‘জিনে মেরে ফেলেছে, গোসল-জানাজা হয়ে গেছে, দাফন করে দিন’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘কবিরাজ’ মাহবুবুর রহমান কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার লালবাগ গ্রামের মৃত মোকছেদ আলীর ছেলে। ছারছিনা মাদ্রাসায় লেখাপড়া শেষে প্রথমে ছারছিনা পীরের মুরিদ ও পরে খাদেম হন। একপর্যায়ে পীরের খলিফা হয়ে কুমিল্লা অঞ্চলের দায়িত্ব নেন। নিজেকে আধ্যাত্মিক চিকিৎসক হিসেবে দাবি করতে শুরু করেন। তার আস্তানার নাম রাখেন ‘হিযবুল্লাহ জামে মসজিদ’। এই মসজিদ থেকেই মাহবুব হিযবুল্লাহ মাদ্রাসা, দরবার ও মুসাফির খানা পরিচালনা করেন।

স্থানীয়রা আরও জানান, ১০ বছর ধরে জ্বীন ও আধ্যাত্মিক চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে আসছেন মাহবুব। প্রথমদিকে নগরীর ৪ নম্বর হাউজিং এস্টেট এলাকায় তিনি চিকিৎসার নামে প্রতারণা শুরু করেন। পরবর্তীতে বারাপাড়া এলাকার রাস্তার অদূরে বহুতল ভবন নির্মাণ করে সেখানে কবিরাজির কার্যক্রম শুরু করেন। রোগীদের জ্বীন, পরী, পেত্নী ও ভূতে ধরেছে বলে লাঠি দিয়ে পিঠে ঝাড়ফুঁক ও নারী রোগীদের মারধর করতেন। চিকিৎসা ও ওষুধের নাম করে টাকা হাতিয়ে নিতেন। তার এসব কার্যক্রমের প্রধান শক্তি স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তাদের হাত করে এই চিকিৎসার ‘সুনাম’ খবর ছড়িয়ে দেন বিভিন্ন অঞ্চলে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কবিরাজ মাহবুবুর রহমান পালিয়ে যাওয়ার পর মসজিদ ও মাদ্রাসাসহ পুরো বাড়িতে কেউ নেই। দুই জন কেয়ারটেকার রয়েছে। তবে তারা তাদের পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। আস্তানার বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন রোগীরা।

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার রত্মাবতী ও মাঝিগাছা থেকে আসা দুই রোগী জানান, তারা আজ (রবিবার) সকালে এসে কবিরাজকে পাননি।

কোতোয়ালি থানার ওসি আবদুস ছালাম মিয়া বলেন, ‘জ্বীন চিকিৎসার নামে শিশুকে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। শিশু ফরিদের মা রোজিনা বেগম বাদী হয়ে শনিবার দিবাগত রাতে কবিরাজ মাহবুবকে প্রধান আসামি করে মামলাটি করেন। কবিরাজ মাহবুব পালাতক রয়েছে। আটক খাদেম শাহাদাতকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স চালককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক রাখা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, শিশুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। লাশ ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। রিপোর্ট হাতে পেলে হত্যার কারণ জানা যাবে।’ 

হিযবুল্লাহ জামে মসজিদ মারা যাওয়া শিশু শেখ ফরিদের চাচা আবেদ হোসেন বাদল বলেন, ‘ফরিদের মা রোজিনা বেগম তাকে নিয়ে গত বৃহস্পতিবার বারপাড়ার কবিরাজ মাহবুবুর রহমানের কাছে যান। কবিরাজ ফরিদকে চালান দিয়ে বলে তার দেহে জ্বীন আছে। শুক্রবার তাকে আবার নিয়ে আসতে বলে। শুক্রবার ফরিদের মা তাকে নিয়ে গেলে কবিরাজ বলে তার দেহ থেকে জ্বীন তাড়ানোর সময় ৭০ গজ দূরে থাকতে হবে। তাকে বাড়িত চলে যেতে বলা হয়। রোজিনা বাড়িতে এসে রাতে মোবাইল ফোনে কল দিলে কবিরাজ জানায়, ফরিদ ঘুমিয়ে আছে। রবিবারের মধ্যে ভালো হয়ে যাবে আর দুষ্টুমি করবে না। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় কবিরাজ মাহবুব ফরিদের মাকে মোবাইল ফোনে জানায়, ফরিদকে সকালে জ্বীনে মেরে ফেলেছে।’

শিশুটির পারিবারিক সূত্রে জানা গেছ, তিন বছরের ছোট্ট শিশু শেখ ফরিদ বেশি দুষ্টুমি করার কারণে শুক্রবার সকালে ওই কবিরাজের কাছে নিয়ে যান তার মা। কবিরাজের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী দুষ্টুমি কমাতে ফরিদকে তিন দিনের জন্য কবিরাজের কাছে রেখে আসেন তিনি। ওইদিন রাতে মোবাইল ফোনে কবিরাজের কাছে ছেলের খবর নেন তিনি। কবিরাজ জানায়, ‘ছেলে ফরিদ ভালো আছে। চিকিৎসা চলছে। রবিবারে এসে নিয়ে যাবেন। একেবারে ভদ্র ও শান্ত হয়ে সব ঠিক হয়ে যাবে।’

এরপর শনিবার (৩১ মার্চ) দুপুরে সাদা কাফনে মোড়ানো শিশু ফরিদের মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের বাড়িতে পাঠায় কবিরাজ মাহবুবুর রহমান। মোবাইল ফোনে সে ফরিদের মাকে বলে, জিনে মেরে ফেলেছে সকালে, গোসল ও জানাজা হয়ে গেছে, দাফন করে দিন।’

/এনআই/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম