কুমিল্লা ইপিজেডের বর্জ্য মিশে যাচ্ছে খাল-বিলে, হুমকির মুখে ফসল ও জলজ প্রাণী

মাসুদ আলম, কুমিল্লা
২৮ জুলাই ২০১৮, ১২:২৩আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৮, ১২:২৩

কুমিল্লা ইপিজেডের শিল্প-কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যমিশ্রিত পানি

কুমিল্লা ইপিজেডের শিল্প-কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যমিশ্রিত পানি চারদিকে প্রবাহিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষাক্ত বর্জ্য সদর দক্ষিণ উপজেলার ডাকাতিয়া ও সোনাইছড়ি খালসহ আশপাশের খাল বিলে গিয়ে পড়ে। এর ফলে জলজ প্রাণীসহ  ১২টি গ্রামের মানুষ এবং হাজার হাজার কৃষি জমির ফসল মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। বর্জ্যমিশ্রিত বিষাক্ত পানির দুর্গন্ধে স্থানীয় এলাকাবাসী বিপাকে পড়েছে। এছাড়া দুর্গন্ধ আর দূষিত পানির প্রভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে এলাকার হাজার হাজার মানুষ। ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

কুমিল্লা ইপিজেডে ২৩৯টি শিল্প প্লট রয়েছে। ২০১৫ সালের কারখানাগুলোর উৎপাদিত পণ্যের রাসায়নিক বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন করা হয়। তবে সেটা চালু আছে কি না? চালু থাকলেও যথাযত ক্যামিকেল ব্যবহার হয় কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন,‘ইপিজেডের কারখানাগুলোর বর্জ্য পরিশোধন করে ময়লা পানি ড্রেনে ছাড়ার নিয়ম থাকলেও তা মানছেন না কর্তৃপক্ষ। কালো রঙের বিষাক্ত পানি দিশাবন্ধ, কাজীপাড়াসহ আশপাশের গ্রামের খাল-বিল ও ড্রেনে মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে পরিবশে দূষিত করছে ও তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ইপিজেডের উত্তর-পূর্ব কর্ণারের শুরঙ্গ দিয়ে শহরে পানি প্রবেশ করছে। ইপিজেডের সীমানা প্রাচীরের নিচ দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব ড্রেন নগরীর বিভিন্ন এলাকার হয়ে রাজাপাড়া ও পশ্চিম-দক্ষিণ কর্ণার উনাইসার হয়ে সিটি করপোরেশনের ১৯ ও ২০ নং ওয়ার্ডের নেউরা, রাজাপাড়া, দিশাবন্দ, হিরাপুর, মস্তাপুর, উনাইশার,দক্ষিণ রামপুর, গ্রাম চাঁদপুর, জেলখানা বাড়ি এবং বাগমারা হয়ে ডাকাতিয়া নদীতে পড়ছে বর্জ্যমিশ্রিত বিষাক্ত পানি।

সদর দক্ষিণ উপজেলা কর্মকর্তা এবং ২০ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাঈন উদ্দীন বলেন, ‘ইপিজেড থেকে আসা পানি টিন এবং লৌহা জাতীয় জিনিসপত্রে লাগলেই মরিচা ধরে যায়। খাল বিলে মাছ, হাঁস নামলে মরে যায় সাধারণ মানুষ হাঁপানিসহ পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ফসলি জমির ক্ষতি হচ্ছে। ’ ইপিজেডের শিল্প-কারখানার বিষাক্ত পানি

দিশাবন্দ গ্রামের বাসিন্দা সংগঠক ও সমাজকর্মী অধ্যাপক আবুল খায়ের টিটু বলেন, ‘২০১৫ সালে ইপিজেডে বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন করা হয়েছে। তবে সেটা চালু আছে কি না? চালু থাকলেও যথাযত ক্যামিকেল ব্যবহার হয় কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। দীর্ঘ মেয়াদী এ সমস্যার ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে ও মানুষ শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও রোগাক্রান্ত হচ্ছে। আমি চাই বহু দিনের এ সমস্যার দ্রুত সমাধান করা হোক।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা জেলার সভাপতি আলি আকবর মাসুম বলেন,‘গত পরিবেশ দিবসেও আমরা এ বিষয়টা নিয়ে বলেছিলাম, শিল্প বর্জ্য বা অন্যান্য ক্ষতিকর কিছু যেন ফসলি জমি বা পরিবেশের ক্ষতির কারণ না হয়। কর্তৃপক্ষকে সে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’

কুসিক ২০ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলার সিদ্দিকুর রহমান সুরুজ বলেন,‘আমি চেয়ারম্যান থাকাকালিন বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দিশাবন্দের ড. আবুল বাসারসহ এটার সমাধানের চেষ্টা করেছিলাম। তবে কোনও ফল পাইনি। আমিও এর ভুক্তভোগী, আমার বাড়ির পাশ দিয়েও এ পানি যায়। আসলে এটার মূলে রাঘব-বোয়ালদের হাত আছে। শহরের পানিতো টমচমব্রিজ-লাকসাম রোড খালসহ অন্য খাল দিয়ে নামে। সে সব খালের পানিতে তো দুর্গন্ধ নেই।এছাড়া টিন ও লৌহা জাতীয় জিনিসপত্রেও মরিচা ধরে না।

কুমিল্লা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) পরিবেশ বিষয়ক কর্মকর্তা মো. আবদুল মালেক বলেন, ‘শহরের পানি উত্তর দিক দিয়ে ইপিজেডে ঢুকে। আমাদের পানি সেন্ট্রাল সিইটিপি থেকে বের হয়। ইপিজেডের পানি আমরা বুয়েট থেকে টেস্ট করাই। একফোটা দূষিত পানি ইপিজেড থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতর নিয়মিত দেখাশোনা করে।’

স্থানীয় কৃষক মো. নুরুল ইসলাম জানান, ইপিজেড থেকে আসা পানির প্রভাবে কৃষি জমি ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। আমি কৃষকের ছেলে। ৩০-৩২ বছর ধরে ক্ষেত খামারে কাজ করি । যদি শহরের পানির কারণে এ সমস্যা হতো, তাহলে তো আমরা ৩০ বছর আগ থেকেই দেখতাম। ইপিজেড তৈরির ৫/৭ বছর পর থেকে যখন কল-কারখানা বেড়েছে তখন থেকে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বজ্র মিশ্রিত কালো পানি আশপাশের খাল বিলে গিয়ে পড়ছে

পরিবেশ অধিদফতর কুমিল্লার উপ-পরিচালক মো. ছামছুল আলম জানান, পরিশোধন ছাড়া ইপিজেডের কোনও বিষাক্ত পানি বা বর্জ্য বের হওয়ার সুযোগ নেই। ইপিজেডের পানি সিইটিপি (কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার) থেকে পরিশোধিত হয়ে বের হয়। বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান আর বর্জ্যমিশ্রিত দূষিত পানি বাহিরের যে অভিযোগ উঠেছে, তা আমরা তদন্ত করে দেখবো।

কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (কুসিক) প্রধান নির্বাহী কমকর্তা অনুপম বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা পরিবেশ অধিদফতরের সঙ্গে কথা বলেছি। তিন মাস আগে ইপিজেডকে চিঠি দিয়েছি। তারা কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান আর বর্জ্যমিশ্রিত পানি পরীক্ষা না করে ড্রেনে ছেড়ে দিচ্ছে। আর সেটা সিটি করপোরেশনের ওপর চাঁপিয়ে দিচ্ছে। সিটি করপোরেশন পঁচা, দুর্গন্ধ ও বর্জ্যমিশ্রিত পানি তৈরি করে নাকি?

 

/জেবি/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম