জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ৬ দিন বাকি। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে নির্বাচনকে ঘিরে কক্সবাজারের রাজনীতির মাঠ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা ও মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর থেকে জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পর প্রচার-প্রচারণা করতে গিয়ে হামলা,মামলা,ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে একে অপরকে দোষারোপ করছে। তবে স্থানীয় প্রশাসন বলছে এসব কিছু মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
কক্সবাজারে চারটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ২০৪ জন। এসব ভোটারদের ভাগিয়ে নিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়াও বিভিন্ন দলের মোট ২৮ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। চালিয়ে যাচ্ছে প্রচার-প্রচারণা। তবে দুই দল একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুরের অভিযোগ করেছেন।
কক্সবাজার-৩ (কক্সবাজার সদর-রামু) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী লুৎফুর রহমান কাজল অভিযোগ করেছেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সাইমুম সরওয়ার কমল নির্বাচনি প্রচারের কাজে বাধা দিচ্ছেন। এছাড়া ভোটারদের হুমকি,মারধর করা শুরু করেছেন। প্রতিনিয়ত বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। হামলার পর উল্টো বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ‘চলতি মাসের ১০ ডিসেম্বর থেকে রামুর পৃথক ৫টি স্থানে ধানের শীর্ষ প্রতীকের পক্ষের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। এতে ৩৫ জন আহত হয়েছে। হামলার প্রতিটি ঘটনায় এমপি কমল উপস্থিত ছিলেন। হামলার পর উল্টো মামলা করে হয়রানিও করা হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাইমুম সরওয়ার কমল পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেন, ‘বিএনপির প্রার্থীর অভিযোগ সঠিক নয়। গত ১২ ডিসেম্বর রামু উপজেলার চৌমুহনী স্টেশনে আওয়ামী লীগের শান্তিপূর্ণ মিছিলে বিএনপির উশৃঙ্খল নেতাকর্মীরা বিনা উসকানিতে হামলা করেছে। এসময় আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী আহত হয়েছে। এঘটনায় স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সত্যতা পেয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কার বিজয় নিশ্চিত জেনে বিএনপির প্রার্থী মিথ্যার প্রলাপ করছে। নানা কারণে নানা অজুহাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর দোষ চাপিয়ে নির্বাচন বানচাল করার পাঁয়তারা শুরু করেছে। সাধারণ জনগণ এসব মিথ্যার প্রলাপ বুঝে গেছে।’
একইভাবে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনেও নির্বাচনি প্রচার নিয়ে বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী ও বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হাসিনা আহমেদের অভিযোগ তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাফর আলম ও তার নেতাকর্মীরা নির্বাচনি প্রচারে হামলা চালাচ্ছেন। ১৩ ডিসেম্বর চকরিয়া থানার সামনেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভাঙচুর ও ফাঁকা গুলিবর্ষণ করছে। এ ঘটনায় থানার ভেতরেই আটকা পড়েছেন তিনি।
তিনি দাবি করছেন, ওইদিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বখতিয়ার উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পর থানা কম্পাউন্ডের বাইরে সন্ত্রাসীরা ভাঙচুর চালায় এবং গুলিবর্ষণ করে। এসময় বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মীকে মারধর করা হয়। পরে থানা রাস্তায় মাথায় উপজেলা শ্রমিক দলের কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়। একইভাবে ১৫ ডিসেম্বর নির্বাচনি প্রচারণার সময় তার গাড়ি ভাঙচুর করেছে এবং গুলি বর্ষণ করেছে।
আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাফর আলম বলছেন, উক্ত ঘটনায় আওয়ামী লীগের কোনও নেতাকর্মী জড়িত নয়। বিএনপির দু’টি গ্রুপ জড়ো হয়ে এই সাজানো নাটক করেছে। যাতে করে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ফেরানো যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ সব কিছু বুঝে গেছে। বিএনপির পাতানো ঘটনায় কান দেবে না সাধারণ মানুষ। কারণ সাধারণ মানুষ উন্নয়নের সঙ্গে আছে এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকবে।
গত ২১ ডিসেম্বর জেলা বিএনপির কার্যালয়ে সংসাদ সম্মেলন করে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের বিএনপি প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী দাবি করেন, উখিয়া ও টেকনাফে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি ও টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের নেতৃত্বে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং পরিকল্পিত হামলা অব্যাহত রেখেছে। বিএনপি নেতাদের যেখানে তারা পাচ্ছেন সেখানেই পেটাচ্ছেন। প্রশাসনের সব জায়গায় নালিশ করেও কোনও প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনও প্রতিকার করছেন না। প্রতিকার না পেয়ে হামলা ও মামলার ভয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাই টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, সাবেক এমপি শাহাজাহান চৌধুরীর অভিযোগ সত্য নয়। এটি মিথ্যা ও বানোয়াট। কথা হচ্ছে, টেকনাফ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহর ছোট ভাই ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা গডফাদার জিয়াউর রহমান এবং বদি একই বাড়িতে থাকেন। তাদের বিরুদ্ধে ৮-১০টি মামলা রয়েছে। তাদের ধরতে বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করা কী পুলিশের অপরাধ?যদি এমন হয়, তাহলে শাহাজাহান চৌধুরী নিজেই ইয়াবার গডফাদার।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের এমপি বদি বলেছেন, ‘আমার নির্বাচনি এলাকায় এমন কোনও মানুষ নেই আমাকে ভালোবাসে না। আমার দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপির নেতারাও আমাকে ভালোবাসেন। এখন নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী শাহাজাহান চৌধুরী পাশে তার নিজ দলের কোনও নেতাকর্মীদের কাছে না পেয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। এছাড়াও নিশ্চিত পরাজয় জেনে প্রলাপ বকছেন শাহাজাহান চৌধুরী।’
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেছেন, নির্বাচনি সহিংস ঘটনায় এই পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেনি। এছাড়াও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য জেলা পুলিশ সব সময় তৎপর রয়েছে। যে দলেরই হউক কেউ অপরাধ করতে ছাড় পাবে না। নির্বাচনে সব কিছু মোকাবিলা করবে পুলিশ।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষ চাই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হউক। এমনটি প্রত্যাশা তাদের।








