গত বছরেও রমজান ও ঈদের আনন্দ পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। তবে এবছর তিনি নেই। নিজের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করে হত্যাকারীর আগুনে ঝলসে প্রাণ দিয়েছেন তিনি। তাকে হারিয়ে ভালো নেই তার পরিবারের সদস্যরা। একমাত্র আদরের মেয়েকে ছাড়া ঈদ করতে গিয়ে শোকে বিহ্বল নুসরাতের মা শিরিন আক্তার ও বাবা এ কে এম মুসা। নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানও বোন হারানোর বেদনায় কাতর।
মঙ্গলবার (৪ জুন) রাতে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে ফোনে কথা হয় নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আক্তারের। পরিচয় দিয়ে ‘ঈদ মোবারক’ বলতেই ফোনের অপরপাশ থেকে শোনা যায় কান্নার শব্দ। শিরিন আক্তার কাঁদতে কাঁদতে জানালেন, দুই ছেলে ও নুসরাতের বাবা এ কে এম মুসা সারারাত ঘুমাননি। মেয়ে ও বোনের জন্য শোকে তারা কাতর। বাবা কোরান তেলাওয়াত করেছেন। কিছুক্ষণ পর পর মা মা বলে নুসরাত নুসরাত বলে ডাকছেন। শিরিন আক্তারের নিজের কণ্ঠও ভারী। কে কাকে দেবেন সান্ত্বনা। তাই ফোনে শিরিন আক্তারের কথা ছাপিয়ে আসছিল কান্নার শব্দ।
নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নুসরাতের কথা আমরা কোনোভাবেই ভুলতে পারছি না। ঈদের দিন বলে নুসরাতকে আরও বেশি মনে পড়ছে। কোনোভাবেই তাদের কান্না আমি থামাতে পারছি না। আসলে আমাদের বুকের ভেতরে আগুন জ্বলছে। আমাদের বুকটা আগুনে পুড়ছে। কী অসহ্য কষ্ট, আপনাকে বোঝাতে পারবো না। আমাদের জীবনে আর কোনোদিন ঈদ আসবে না।’
কথায় কথায় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান । জানালেন, প্রতিবছর রমজানে ইফতার তৈরি থেকে শুরু করে সবাই মিলে ইফতার করার স্মৃতি কোনোভাবে আমরা ভুলতে পারছি না। প্রতি ঈদে নুসরাতকে নিয়ে ১০ রমজানের মধ্যে নতুন জামা কিনতে মার্কেটে যেতাম মায়ের সঙ্গে। তার পছন্দের কাপড় প্রথম কিনে তারপর আমাদের জন্য ঈদ বাজার শুরু করতাম। প্রতিবছর নুসরাত আমার ও মা এবং বাবার জন্য জামা পছন্দ করে কিনতো। বাবা ও মা সাধ্য মতো নুসরাত ও রায়হানের আবদার মেটানোর চেষ্টা করতেন ।
যে বোন ছিল আমাদের আশার বাতি, সেই বোনকে নিজের সঙ্গে হওয়া ভয়াবহ নির্যাতনের বিচার চাইতে গিয়ে ও নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করতে হলো।
নুসরাতের বাবা মুসা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের এবারের ঈদে কোনো আনন্দ নেই। সব আনন্দ শোকে পরিণত হয়েছে। নুসরাতের শূন্যতা আমাদের অনেক কষ্ট দিচ্ছে। জানি না সামনের দিনগুলোতে কীভাবে এই শোক কাটিয়ে উঠবো।
তিনি আরও বলেন, ‘নিজে বেশি পড়ালেখা করতে পারিনি। খুব ইচ্ছে ছিল মেয়েটাকে মানুষ করবো। কিন্তু আর হলো না। সবাই পরিজন নিয়ে ঈদ করছে। আর আমি একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে কাঁদছি। আল্লাহ কেনো আমাকে এই শাস্তি দিলেন জানি না।’
প্রসঙ্গত, ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম (এইচএসসি) পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে যান নুসরাত। এরপর কৌশলে তাকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে ৪-৫ জন বোরকা পরিহিত ব্যক্তি তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে তার স্বজনরা প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। পরে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। ১০ এপ্রিল রাতে নুসরাত মারা যান। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাসহ আট জনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারভুক্ত আট আসামিসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একইসঙ্গে মামলাটি ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়েছে।






