‘এলাকার বখাটে হিসেবে চিনতাম ওয়াসিম ও রনিকে। ওরা মাদক সেবন ও নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। ওরাই যে আমার ছেলেকে এভাবে মেরে ফেলবে তা কখনও ভাবতে পারিনি।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বললেন ছেলে হারানো সামছুল হক।
শুধু এমরানের বাবা নয়, এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে ওয়াসিম আকরাম ও রনি সম্পর্কে এসব কথা বলেছেন। এমরানের বাবা সামছুল হক ও মা রাফিয়া বেগম সন্তানের ওপর পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।
প্রসঙ্গত, বেগমগঞ্জের ছয়ানী ইউপির শরীফপুর গ্রামে এমরান গত ২২ আগস্ট দুপুর থেকে নিখোঁজ ছিল। ২৩ আগস্ট তার বাবা বেগমগঞ্জ থানায় একটি জিডি করেন। জিডির ভিত্তিতে পুলিশ অনুসন্ধান চালিয়ে ২৫ আগস্ট রাতে ছয়ানী বাজারের শহীদের পরিত্যক্ত একচালা টিনের দোকান ঘরের ভেতরে একটি প্লাস্টিকের মাছের ঝুড়ির মধ্য থেকে গলায় রশি প্যাঁচানো অবস্থায় এমরানের লাশ উদ্ধার করে। হত্যাকাণ্ডটির তদন্তে নেমে কিছু তথ্যের ভিত্তিতে মামলার অন্যতম আসামি ওয়াসিম আকরামকে ১ সেপ্টেম্বর ছয়ানী বাজার থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে সে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। আর বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে ফেনী থেকে রনি নামে আরেকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রনি পিকআপের ড্রাইভার।
বেগমগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নূরে আলম জানান, ২২ আগস্ট বিকালে এমরানকে দোকানে বসিয়ে রেখে তার বাবা বাজার করতে যান। সন্ধ্যায় দোকানে এসে ছেলেকে না পেয়ে আশেপাশে খোঁজাখুঁজি করেন। প্রথমে এলাকায় মাইকিং করেন, এরপর থানায় জিডি করেন। পরে ঘটনার তদন্তে নেমে পাওয়া কিছু তথ্যের ভিত্তিতে তারা ওয়াসিমকে গ্রেফতার করেন। সে জানায়, বাজারে ঘোরাঘুরি করতে দেখে তারা এমরানকে চিপস খাওয়ানোর কথা বলে ডেকে শহীদের টিনের ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে শিশুটির মুখ দিয়ে ফেনা বের হলে তার গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে মৃতদেহটি প্লাস্টিকের মাছের ঝুড়িতে ভরে সেখানে লুকিয়ে রেখে তারা চলে আসে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন জানান, এই ঘটনায় দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি দু’জনকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আটক ওয়াসিম একই ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের লক্ষ্মণপুর গ্রামের বরন্দাজ বাড়ির আব্দুর রহমান ওরফে মহিনের ছেলে। বর্তমানে তারা একই ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের বড় মেহেদিপুর গ্রামে বসবাস করছে। ওয়াসিমের বাবা প্রায় ২০ বছর ধরে সৌদি আরবে আছেন।
সে এবছর ছয়ানী ইমামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করে বেগমগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর হানিফ ভূঁইয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হয়।
ছয়ানী ইমামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসমাইল জানান, ওয়াসিম ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, নামাজ কাজা করাসহ শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করতো। তবে সে যে কাজ করেছে তার তীব্র নিন্দা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জানান, ওয়াসিম তাদের পুরনো বাড়ির মো. নবীর ছেলে আবদুর রহমান, মানিক ড্রাইভারের ছেলে রনি, বেপারী বাড়ির বাচ্চু মিয়ার ছেলে জাফর ও সোহরাব মাঝির ছেলে সোহেলসহ ৮-১০ জন বখাটের সঙ্গে চলাফেরা করত। এদের মধ্যে আবদুর রহমান ও রনি পিকআপের ড্রাইভার, জাফর পিকআপের হেলপারির কাজ করে। তারা এলাকায় ইয়াবাসহ মাদক ও অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। ওয়াসিম ধরা পড়ার পর থেকে বাকিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। এদের মধ্যেই কেউ কেউ এমরান হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রতিনিধি জানান, ছয়ানী বাজারে বাবু বাহিনী নামে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। বাবু চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও ধর্ষণ মামলায় প্রায় ২ মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন। ওয়াসিম এক সময় এই বাবু বাহিনীর সদস্য ছিল।
ছয়ানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন রশিদ বলেন, ‘এমন ন্যক্কারজনক কাজের তীব্র নিন্দা জানাই। আমার এলাকার জনগণ এ ঘটনা এবং এর পেছনে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনাসহ একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানাই।’
আরও পড়ুন:
শিশু এমরান হত্যা: ফেনী থেকে আরেক আসামি গ্রেফতার
সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় ৮ বছরের এমরানকে








