ব্রাহ্মণবাডিয়ায় মাদক চোরাচালন নিয়ন্ত্রণে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি)সদস্যরা। তারা মাদক ব্যবসায়ীদের বাড়ি লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করে দিচ্ছেন। জেলার বিজয়নগর, কসবা ও আখাউড়া উপজেলার অন্তত ১৫ মাদক ব্যবসায়ীর বাড়িতে তারা লাল রং দিয়ে লিখে দিয়েছেন—‘মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি’ বা ‘ইয়াবা ব্যবাসায়ীর বাড়ি’। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা সামাজিকভাবে মর্যাদা হারাবে এবং মাদক চোরাচালান থেকে বিরত থাকবে।
সরেজমিনে বিজয়নগর উপজেলার সিমান্তবর্তী সিংগার বিল ও কাশিনগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, লাল রং দিয়ে মাদক ব্যবসায়ী মো. রবিউল ইসলামের বাড়ির মাটির ঘরের দেয়ালে এক বিজিবি কর্মকর্তা লিখছেন—‘মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি’। ওই মাদক ব্যবসায়ী গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চারশ’ পিস ইয়াবাসহ বিজিবি’র হাতে ধরা পড়ে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। সে এখন জেলহাজতে আছে বলে বিজিবি’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
লাল কালি দিয়ে দেয়ালে লেখার সময় বাড়িতে অবস্থান করছিলেন রবিউল ইসলামের মা মাহমুদা ও স্ত্রী তানিয়া আক্তার। ছয় মাসের বাচ্চা কোলে নিয়ে তানিয়া কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেকবার স্বামীকে মাদক ব্যবসা থেকে সরে আসার জন্য বলেছি। কোনও কাজ হয়নি। এখন আমাদের বাড়িতে লাল রং দিয়ে লেখা হচ্ছে— ‘মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি’। সমাজে আমরা মুখ দেখাবো কীভাবে?’ এসময় রবিউলের মা মাহমুদা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘জেল থেকে মুক্তি পেলে রবিউলকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেবো। এই কাজ আর করতে দেবো না।’
লাল রং দিয়ে লিখার খবর পেয়ে রবিউলের বাবা পাশের বাজার থেকে দ্রুত বাড়িতে আসেন। বিজিবি সদস্যদের দেয়ালে লেখা দেখে তিনি লজ্জায় কিছুক্ষণ নিরব ছিলেন। পরে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ছেলেকে ত্যাজ্য করে দিয়েছি। সে আমার ছেলে না।’
একই এলাকার ইনছাব আলী ভাণ্ডারি সীমান্ত দিয়ে গাঁজা পাচার করতেন। তাকে সম্প্রতি বিজিবি সদস্যরা দুই কেজি গাঁজাসহ গ্রেফতার করেন। তার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের একটি মামলা রয়েছে। তার বাড়িতেও লাল কালি দিয়ে লেখা হয়—‘মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি’।
একইভাবে আখাউড়া উপজেলার আজমপুর গ্রামের মো. হুমায়ুন মিয়ার বাড়িও লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। হুমায়ুন গত ১৫ সেপ্টেম্বর ১৩ বোতল ভারতীয় স্কপ সিরাপ নিয়ে বিজিবির হাতে গ্রেফতার হয়। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। একই এলাকার ইসহাক মিয়া ও জামাল চৌধুরীর বাড়িও লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। জামাল চৌধুরী গত ৯ সেপ্টেম্বর ৩৫ বোতল ফেনসিডিল নিয়ে বিজিবির হাতে আটক হয়। অন্যদিকে, ইসহাক মিয়া গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০ বোতল স্কপ সিরাপসহ বিজিবি’র হাতে ধরা পড়ে।
প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সিংগার বিল রেল গেইট এলাকায় জড়ো হন উৎসুক মানুষ। তাদের মধ্যে মাঝবয়সী ছাদেক মিয়া, বিল্লাল মিয়া ও রঙ্গু মিয়া বলেন, আমাদের এলাকা মাদক অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এতে এলাকার বদনাম হচ্ছে। আত্মীয়-স্বজনরা এলাকায় আসতে চান না। একই এলাকার গনি মিয়া ও রবি মিয়া জানান, বদনামের কারণে ছেলেমেয়েকে অন্য এলাকায় ভালো পরিবারে বিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিজিবি’র পক্ষ থেকে লাল রং দিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের বাড়ি চিহ্নিত করার কাজ করা হচ্ছে। তারা চলমান এই কাজকে সাধুবাদ জানান।
বিজিবি'র ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান, বিজয়নগর উপজেলার সিংগার বিল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. সাঈদুর রহমান ও আখাউড়া উপজেলার আজমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরুন্নাহার বেগম। তারা জানান, বিজিবি'র এ উদ্যোগের কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা সামাজিকভাবে মর্যাদা হারাবে। তারা একঘরে হয়ে পড়বে। এটাই হবে তাদের জন্যে বড় শাস্তি।
বিজিবি’র সিংগার বিল ক্যাম্পের কমান্ডার সুবেদার মো. আজিজুর রহমান ও আজমপুর ক্যাম্পের কমান্ডার নায়েক সুবেদার মখলেছুর রহমান বলেন, ‘আমরা মাদক ব্যবসায়ীদের বাড়িতে লিখে যাচ্ছি। এই লেখা মুছলে তার বিরুদ্ধে মামলা হবে। এটি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ।’
বিজিবি ২৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল গোলাম কবির জানান, ‘আমাদের মহাপরিচালক মহোদয়ের নির্দেশক্রমে সীমান্ত অঞ্চলে এই কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। মাদক ব্যবসায়ীরা সামাজিকভাবে যেন মর্যাদা হারায়, এ জন্যই এই উদ্যোগ। বিজয়নগর, কসবা ও আখাউড়া উপজেলার ৭২ কিলোমিটার সীমান্ত জনপদের মধ্যে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রত্যেক মাদক ব্যবসায়ীর বাড়িতে এ কাজ করা হবে।’








