ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি খোরশেদ মিয়া। তিনি গোমতী নদীর চরে সারাবছর বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেন। মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, কুমড়া, আলু, টমেটো, মরিচ ও বেগুনসহ বিভিন্ন জাতের শীতকালীন সবজি ছাড়াও সারা বছরই ব্যস্ত সময় পার করেন। তিনি কুমিল্লা সদর উপজেলার পাঁচথুবী ইউনিয়নের জালুয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। অনেক বছর ধরেই এই সবজি চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নিজের তৈরি বীজতলা ও চারা দিয়ে এসব সবজি চাষ করছেন। অতিরিক্ত চারা হাট-বাজারসহ বিভিন্ন প্রান্তিক কৃষকদের কাছে বিক্রি করেন তিনি।
খোরশেদ মিয়া জানান, বীজতলাসহ প্রায় দেড়শ’ শতক জমিতে এবার শীতকালীন সবজি চাষ করেছেন। চাষ হওয়া জমির মধ্যে কিছু নিজের, আর বেশিরভাগ জমি বর্গা নিয়েছেন। তিনি গত বছরও শীতকালীন সবজি চাষ করে লাভবান হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘গোমতী নদীর চরের মাটি অত্যন্ত উর্বর। নদীর কাছে থাকায় পানির অভাব পড়ে না। সবজি চাষের জন্য গোমতীর চর একটি আদর্শ জায়গা। মুলা শীতকালীন সবজি হলেও এই চরে সারাবছরই মুলা চাষ করা হয়। বছরে দুই থেকে তিনবার উঠানো হয়।’
খোরশেদ মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘জেলা ও উপজেলার মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা তাদের কাছে আসেন না। চাষি এবং ফসলের খোঁজ রাখেন না। কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতার অভাবে পোকা-মাকড় দমনসহ তারা ফসলে সঠিক উপাদান ব্যবহার করতে ব্যর্থ হন।’
তবে তিনি আরও বলেন, ‘সবজি চাষ ও চারা উৎপাদনে কুমিল্লা জেলার কৃষকরা নিজেরাই অনেক অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। এছাড়া কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এ জেলায় সবজি চাষ ক্রমেই বাড়ছে।’
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সুরজিত চন্দ্র দত্ত জানান, কুমিল্লা জেলার ১৭ উপজেলার মধ্যে আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, বরুড়া, লালমাই, চান্দিনা, দাউদকান্দি, দেবিদ্বার ও মুরাদনগরসহ অন্যান্য উপজেলার কৃষকরা অনেকটা বড় পরিসরে সবজি চাষ করে থাকেন। এর মধ্যে চান্দিনা, দাউদকান্দি, সদর দক্ষিণ, লালমাই ও বরুড়া উপজেলার কৃষকরা সবজি চাষের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের চারাও উৎপাদন করেন। অবশ্য চারা উৎপাদনের দিক দিয়ে জেলার মধ্যে চান্দিনা উপজেলা এখনও শীর্ষে রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠে মাঠে যেন সবুজের হাসি বিরাজ করছে। কেউ ক্ষেতে সবজির চারা রোপণ করছেন। আবার কেউ চারায় পানি দিচ্ছেন। অনেকে ক্ষেতে কীটনাশক স্প্রে করছেন। কেউ কেউ নতুন করে আবাদের জমি প্রস্তুত করছেন। আবার বিভিন্ন জাতের চারা উৎপাদনেও ব্যস্ত অনেক চাষি। সব মিলিয়ে ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, শিম, টমেটো, কাঁচামরিচ, মুুলা, করলা, লাউ, ঢেঁড়শ, গাঁজর, লালশাক, পালংশাকসহ বিভিন্ন জাতের সবজিতে ভরে উঠেছে ফসলের মাঠ।
গোমতীর চরের আরেক সবজি চাষি আলমগীর হোসেন জানান, গোমতী নদীর চরের সব জায়গায় ভালো ফসল হয়। একদিকে উর্বর মাটি অন্যদিকে সেচ কাজে নদীর পানি ব্যবহার করা যায়। যে কারণে চরে সবজি চাষ করে লাভবান হওয়া যায়। কিন্তু সাধারণ জমিতে সবজি চাষ করলে খরচ বেশি হয়, তাই বেশি লাভ হয় না।
অন্যদিকে একই এলাকার কৃষক মো. মীর কাশেম অভিযোগ করে বলেন, ‘এবার ৩০ শতক জমিতে শীতকালীন সবজি মুলা, বাঁধাকপি, ফুলকপি ও মরিচ চাষ করেছি। প্রতিবছরই জমিতে ভালো ফসল হয়। ফলন ভালো হলেও পোকা-মাকড়ের আক্রমণে সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিন বছর হবে কোনও কৃষি কর্মকর্তা মাঠে আসেন না। আমাদের ফসলের খোঁজ নেন না। সঠিক দিক-নির্দেশনার অভাবে আমরা লোকসানে মুখে পড়তে পারি।’
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সুরজিত চন্দ্র দত্ত বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে ও বাজারদর ভালো থাকলে শীতকালীন সবজি চাষে লাভবান হবেন কৃষকরা। শীতের সবজি চাষে গোমতী নদীর চর ও কুমিল্লা জেলার কৃষকরা বরাবরই ব্যস্ত থাকেন।’
কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের কাজই হচ্ছে প্রান্তিক কৃষক ও চাষিদের খোঁজ-খবর রাখা। কৃষক ও চাষিদের সেবায় যদি কোনও এলাকার কৃষি কর্মকর্তারা অবহেলা করেন, এমন অভিযোগ পেলে জেলা কৃষি বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।








