কোথায় লুকিয়ে রোহিঙ্গা ডাকাত হাকিম

আবদুল আজিজ, কক্সবাজার
০৫ নভেম্বর ২০১৯, ২২:৪৫আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ২২:৪৯




গোপন আস্তানায় আবদুল হাকিম (ছবি সংগৃহীত) রোহিঙ্গা ডাকাত আবদুল হাকিম। টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চল ও মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করেছেন। এ সময়ের মধ্যে ডাকাতি, খুন, অপহরণ, ধর্ষণ ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন আবদুল হাকিম। অভিযোগ রয়েছে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে তার। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়েও তাকে ধরতে ব্যর্থ হয়। এখন ভুক্তভোগী স্থানীয়দের প্রশ্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে কোথায় রয়েছে ডাকাত হাকিম?

অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় পাহাড়ি এলাকা থেকে সরে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। আবার কেউ বলছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাড়াশি অভিযান থেকে বাঁচতে কক্সবাজার শহর এলাকায় গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। অবশ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, টেকনাফের শীলখালী পাহাড়ি এলাকায় তার সর্বশেষ আস্তানা ছিল। এখন সে সরে গেছে।

কে এই আবদুল হাকিম: মিয়ানমারের মংডু আনডাং কুলং বড়ছড়া এলাকার জানে আলম ওরফে জয়নাল আলীর ছেলে আবদুল হাকিম। মিয়ানমারে ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন তিনি। গত দুই যুগ আগে হাকিম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তাকে খুন করে দেশ ছাড়েন, পালিয়ে আশ্রয় নেন টেকনাফে। সঙ্গে নিয়ে আসেন স্ত্রী-সন্তান ও পাঁচ ভাইকে। তার ভাই বশির আহমদ, কবির আহমদ (বন্দুকযুদ্ধে নিহত), নজির আহমদ এবং হামিদ হোছনও নানা অপরাধে যুক্ত।

অভিযোগ রয়েছে, কুতুবদিয়া দ্বীপে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জন্ম নিবন্ধনসহ ভোটার আইডি তৈরি করে নিয়েছেন হাকিম ও তার পরিবারের সদস্যরা। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের মিস্ত্রীপাড়ার জহির আহমদ ওরফে গাছ জহিরের মেয়ে ইসমত আরাকে বিয়ে করেন হাকিম। ইসমতের ভাই নুইজ্জা ডাকাত হাকিমের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত। হাকিম বাংলাদেশে আসার পর প্রথমে টেকনাফ উপজেলা পরিষদের পেছনের সরকারি বনভূমিতে ভবন তৈরি করে বসবাস করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে অন্য জায়গায় সরে যান।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি একাধিক বিয়ে করেছেন। চলতি বছরের ৮ আগস্ট টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালালে পুলিশের ওপর হামলা ডাকাত হাকিম বাহিনীর সদস্যরা। অভিযানে তার স্ত্রী হিসাবে পরিচিত টেকনাফের পল্লানপাড়া এলাকার রুবি আক্তার (৪০) ও ডাকাত হাকিমের ভাই কবির আহমদ (৩২) নিহত হয়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অস্ত্র লুট: ২০১৬ সালের ১৩ মে হাকিম ও তার বাহিনীর সদস্যরা হামলা চালিয়ে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া মুছনী রোহিঙ্গাশিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার ব্যারাকে লুটপাট চালায়। এসময় গুলিতে নিহত হন ব্যারাকের আনসার কমান্ডার মো. আলী হোসেন। এসময় আনসারের ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৬৭০টি গুলি নিয়ে পাহাড়ে আত্মগোপন করে হাকিম ডাকাত। পরদিন হাকিমসহ বাহিনীর ৩৫ সদস্যের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় খুনসহ অস্ত্র লুটের মামলা হয়। পরে র্যাব বিভিন্ন আস্তানায় হানা দিয়ে লুন্ঠিত ৯টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১১৫টি গুলিসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়। তবে হাকিম ডাকাত রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় হাকিম ডাকাত: অভিযোগ রয়েছে কক্সবাজারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়ে হাকিম ডাকাতের বাড়বাড়ন্ত। নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে ছোট ভাই নজির আহমদকে বিয়ে দেন সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির মামাতো ভাই জাহাঙ্গীরের মেয়ের সঙ্গে। নজির টেকনাফ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম হত্যা মামলার আসামি। হাকিমও টেকনাফসহ আশপাশের এলাকার একাধিক হত্যা মামলার আসামি।

অভিযোগ রয়েছে, হাকিম ২০১৫ সালের ১২ জুন সেলিম ওরফে মুন্ডি সেলিমকে হত্যা করেন। নুরুল কবির নামে একজনকেও খুন করে হাকিম বাহিনীর সদস্যরা। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের মংডুর বাসিন্দা নুরুল হকের ছেলে নুর হাফেজ ও নাইট্যংপাড়ার মৃত মোহাম্মদ কাশিমের ছেলে তোফায়েলকেও অপরহরণ করে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

পাহাড়ে হাকিমের একাধিক আস্তানা: টেকনাফের গহীন অরণ্যে রয়েছে হাকিম ডাকাতের একাধিক আস্তানা। টেকনাফের ফকিরামুরা ও উড়নিমুরা নামে পরিচিত গহীন বনের বিশাল এলাকায় এসব আস্তানার অবস্থান। এখানে তার বাহিনীর অন্তত অর্ধশত অস্ত্রধারী ক্যাডারেরও বসতি রয়েছে। হাকিমের সঙ্গে সব সময় দুটি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র থাকে। এছাড়া একাধিক দেহরক্ষী নিয়েও চলেন তিনি। কক্সবাজার ও টেকনাফ শহরের বিভিন্ন স্থানে আছে তার একাধিক সোর্স। পাহাড়ের কোন স্থানে হাকিম কখন অবস্থান করেন তা কেউ জানেন না। বছর দুই-এক আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একবার অভিযান চালিয়ে তার আস্তানা থেকে একটি স্যাটেলাইট ফোনসেটও উদ্ধার করেছিল। তবে তাকে ধরা সম্ভব হয়নি।

মিয়ানমারে মোস্ট ওয়ান্টেড হিসেবে তালিকাভুক্ত এই হাকিমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একাধিক পতাকা বৈঠকেও আলোচনায় হয়েছে। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিকে হাকিমের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের পুলিশের এক কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় সাতটি হত্যা, ছয়টি অপহরণ, দুটি মাদক, দুইট ডাকাতি ও একটি ধর্ষণ মামলা রয়েছে।

হাকিমকে ধরার বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আবদুল হাকিম একজন ডাকাত ও মাদক ব্যবসায়ী। খুন, ধর্ষন, ডাকাতি ও অপহরণসহ নানা অপরাধে জড়িত। আবদুল হাকিম ও তার সহযোগীদের ধরতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। তবে হাকিম দলবল নিয়ে পাহাড়-জঙ্গলে লুকিয়ে থাকায় ধরতে সমস্যা হচ্ছে।’

র‌্যাব-১৫ কক্সবাজারের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মেহেদী হাসান বলেন, ‘আবদুল হাকিম ডাকাতের বেড়ে ওঠা গরুর চোরাকারবারির মাধ্যমে। মিয়ানমার থেকে গরুর চালান নিয়ে আসতো বাংলাদেশে। পরে জড়িয়ে পড়ে ইয়াবা ও অস্ত্র কারবারে। এক সময়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে গড়ে তোলে ডাকাত বাহিনী। ডাকাতি, খুন, অপহরণ, ধর্ষণসহ নানা অপরাধে ভয়ঙ্ককর হয়ে উঠে আবদুল হাকিম। সে আরএসও’র সঙ্গেও জড়িত। সর্বশেষ টেকনাফ বাহারছড়া ইউনিয়নের শীলখালী এলাকায় দুটি স্কুল শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে পুনরায় আলোচনায় আসে সে। র্যাব তাকে ধরার জন্য একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে।’ তাকে ধরতে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

/টিটি/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম