চট্টগ্রাম মহানগর কৃষক লীগের এক অনুষ্ঠানে নিহত ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর মায়ের তোপের মুখে পড়েছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। অনুষ্ঠানে মেয়রকে দেখে দিয়াজের মা ও চট্টগ্রাম নগর কৃষক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক জাহেদা আমিন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি ছেলে হত্যার বিচারের দীর্ঘসূত্রতার জন্য মেয়রকে দায়ী করেন। অনুষ্ঠানের কেন্দ্রস্থলে বাইরে তিনি অভিযোগ করেছেন, মেয়র খুনিদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন বলায় মেয়রের অনুসারীরা তাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, পরে সম্মেলন কক্ষ থেকে বের হলে মেয়রের ব্যক্তিগত সহকারী রায়হান ইউছুফ ও তার গানম্যান পরিদর্শক রাশেদও তাকে অপমান করেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেয়রের ব্যক্তিগত সহকারী।
মঙ্গলবার (৩১ ডিসেম্বর) বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের আব্দুল খালেক মিলনায়তনে ‘সন্ত্রাস-দুর্নীতি ও মাদকবিরোধী’ শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে কৃষক লীগ। এ উপলক্ষে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র নাছির উদ্দিন ছিলেন প্রধান বক্তা ছিলেন।
২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর গেট এলাকায় ভাড়া বাসায় নিজ কক্ষ থেকে দিয়াজের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলা হয়। কিন্তু পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে আত্মহত্যা নয়, দিয়াজকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতিসহ আরও কয়েকজন নেতাকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিরা সবাই নাছির উদ্দিনের অনুসারী ছিলেন। দিয়াজ ইরফান নিজেও মেয়রের অনুসারী হিসেবে রাজনীতি করতেন।
ঘটনার সর্ম্পকে জানতে চাইলে জাহেদা আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে জানতাম না এই অনুষ্ঠানে নাছির উদ্দিন সাহেব আসবেন। গিয়ে যখন দেখি ব্যানারে তার নাম রয়েছে। তখন আমি সাধারণ সম্পাদককে বলেছিলাম, মেয়র আসার আগে চলে যাবো। আমি তাকে আরও বলেছি, একজন দুর্নীতিবাজ, একজন সন্ত্রাসী, এখনও পদে আছেন, তাই আমি কিছু বলতে পারছি না। আপনারা তাকে দিয়ে শপথবাক্য পাঠ করাচ্ছেন, উনার কাছে আমি শপথবাক্য পাঠ করবো না। তখন উনি আমাকে বলেছেন, আচ্ছা ঠিক আছে আপনি বক্তব্য দিয়ে মেয়র আসার আগেই চলে যাবেন। কিন্তু আমার বক্তব্যের মাঝপথে মেয়র অনুষ্ঠানস্থলে চলে আসেন। এসেই আমাকে দেখে তিনি বলেন, দিয়াজের মা না? তিনি এখানে কেন?
দিয়াজের মা আরও বলেন, মেয়রকে দেখে ছেলে হারানোর শোক আমার আরও বেড়ে যায়। তখন মেয়রকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি আজ শপথবাক্য পাঠ করাবেন। কিন্তু আপনি কেন দুর্নীতিবাজ, খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। দিয়াজ হত্যার বিচারে আপনি আমাকে সহযোগিতা করছেন না। আপনার নেতৃত্বে কেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল মিথ্যা ময়নাতদন্ত রিপোর্ট দিলো? যখন আমি এই প্রশ্নগুলো মেয়রকে করছিলাম তখন তার অনুসারীরা আমাকে মঞ্চ থেকে নামানোর জন্য জোরাজুরি শুরু করেন। তখন মঞ্চ থেকে দ্রুত নেমে চেয়ারে বসে যাই। কারণ, অনুষ্ঠানটি আমার সংগঠনের, সেখান থেকে কেন বের হয়ে যাবো। তাই আমি বসে পড়ি।
জাহেদা আমিন আরও বলেন, “এরপর মেয়রের বক্তব্য শুনব না ভেবে হলরুম থেকে বের হয়ে সামনে দাঁড়াই। তখন মেয়রের পিএস রায়হান ইউসুফ ও রাশেদ নামে আরেকজন আমার সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করে। রাশেদ প্রথমেই আমাকে তুই করে সম্বোধন করেন। বলেন, ‘তুই এখানে কী শুরু করেছিস? তোর ছেলে ওইদিন বাসায় মেয়ে নিয়ে গেল কেন? এটাতো মেয়ে গঠিত’। তখন আমি তাকে বললাম, আপনি যদি জানেন এটা নারী গঠিত, তাহলে আপনি ধরিয়ে দেন। আমিতো আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। সেটি নারী গঠিত হোক আর রাজনৈকি কারণে হোক। যে কারণেই হোক আমার ছেলেকে তো হত্যা করা হয়েছে। আমি হত্যার বিচার চাইছি, আপনার কাছে যদি প্রমাণ থাকে প্রমাণ দেন। তখন রায়হানও আমার সঙ্গে তর্কাতর্কি শুরু করেন। এক পর্যায়ে রাশেদ আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘একটি সিএনজি নিয়ে এখান থেকে দ্রুত চলে যান’।”
তবে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ নাকচ করে মেয়রের ব্যক্তিগত সহকারী রায়হান ইউছুফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তাকে অপমানিত করার কোনও প্রশ্নই আসে না। দিয়াজ আমাদের ছেলে ছিল, তার মায়ের সঙ্গে আমরা কেন খারাপ আচরণ করব? এ কথা বাদ দিলেও মায়ের বয়সী একজন নারীর সঙ্গে কেন খারাপ আচরণ করব? খারাপ আচরণ করার প্রশ্নই আসে না। মেয়রকে দেখে উনি হঠাৎ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এসময় তিনি মেয়র সাহেবকে দোষারোপ করে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। আবার অনুরোধও করেন। আমরা পেছনে বসেছিলাম। কৃষক লীগের নেতারাই উনাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিয়েছেন। এরপর একবার তিনি বের হয়ে আসেন, তখন আমার সঙ্গে দেখা হয়। আমি স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছি। তাকে বলেছি ধৈর্য্য ধরার জন্য । বলেছি আইনি প্রক্রিয়া চলছে, সিআইডি তদন্ত করছে। আশা করছি ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত বের হয়ে আসবে।’
রায়হান ইউছুফ আরও বলেন, ‘অপমান অথবা হুমকি দেওয়ার বিষয়টি একে বারে মিথ্যে। তিনি কী কারণে, কেন এমন করছেন তা আমাদের জানা নেই। তিনিই ভালো বলতে পারবেন।’








