ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান বাহার (৪৫) হত্যা মামলায় চার জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন জেলা ও দায়রা জজ আদালত। সোমবার (৬ জানুয়ারি) দুপুরে জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ সফিউল আজম এই রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার কনিকারা গ্রামের মো. নূরু মিয়া, কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার মকলিশপুর গ্রামের মো. জিয়াউল হক, একই উপজেলার বাঙ্গরা গ্রামের লোকমান খান ও একই উপজেলার মো. কাদির হোসেন।
এই মামলার অপর আসামি মো. বাবুল মিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় ২০১৮ সালের ১৬ জুন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়কের প্রতিবেদনের আলোকে গত ২০১৮ সালের ৫ আগস্ট মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় আসামি জিয়াউল আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকিরা এই মামলা থেকে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর থেকে পলাতক রয়েছে।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণী থেকে জানা গেছে, নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি উপজেলার আম্বরনগর গ্রামের ছেলে আবদুল হান্নান বাহার ঢাকার চকবাজারে তার মালিকানাধীন ‘বিপুল এন্টারপ্রাইজ’ নামক দোকানে কসমেটিক ও ইমিটেশনের ব্যবসা করতেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা বাহারের দোকান থেকে পাইকারী মালামাল কিনতেন।
২০১৪ সালের ৪ আগস্ট দুপুর তিনটার দিকে বাহার তার বকেয়া পাওনা টাকা আনতে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজারে তার পাইকার লোকমান খানের কাছে যান। লোকমান পাওনা টাকা পরিশোধ করবেন বলে বাহারকে বাঙ্গরা বাজারে ডেকে নেন।
দোকানে যাওয়ার পর লোকমান তার শ্বশুর বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে বাহারকে একটি ইঞ্জিন নৌকায় তুলে নিয়ে যান। পরে ওইদিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে তার ব্যবহৃত (ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান বাহার) মোবাইল ফোন থেকে স্বজনদের কাছে মুক্তিপণ হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
অপহরণকারীরা বাহারকে নৌকায় আটকে রেখে তার আত্মীয়-স্বজনদের কাছে কয়েক দফা মুক্তিপণ দাবি করে। কয়েক দফা মুক্তিপণের টাকা দেওয়ার পরও আসামিরা ৪ থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত বাহারকে হাত-পা বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করে। আরও টাকা আদায়ের জন্য বাহারকে হত্যার হুমকি দেয় আসামিরা।
এরইমধ্যে ৬ আগস্ট রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে আসামিরা বাহারকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার উজানচর লঞ্চ ঘাটের বিপরীত দিকে তিতাস নদীতে ফেলে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। ৮ আগস্ট বিকাল ৩টার দিকে নদী থেকে বাহারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় বাহারের ছোট ভাই বেলাল হোসেন বাদী হয়ে ৯ আগস্ট বাঞ্ছারামপুর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা তদন্ত করে হত্যার ঘটনা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তদন্তে আসামিদের নাম নথিভুক্ত করে তার বিরুদ্ধে ওই বছরের ১০ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
পরে পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামি নুরু মিয়া ও জিয়াউলকে গ্রেফতার করেন। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এ সময় তারা হত্যায় নিজেদের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের নাম বলেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে সোমবার দুপুরে বিচারক মামলাটি সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মামলার চার আসামির মৃত্যুদণ্ড দেন।
এ ব্যাপারে মামলার রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট এস.এম ইউসুফ বলেন, ‘এই আদেশের ফলে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
এদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী জসিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় রায়টি সঠিক হয়নি। আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করবো।’
এদিকে এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজনরা। তারা রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান।








