করোনাভাইরাস সংক্রমণে রেড জোনের আওতায় পড়া কক্সবাজারে চলছে ১৪ দিনের লকডাউন। সোমবার (৮ জুন) লকডাউনের তৃতীয় দিনে প্রশাসনকে কঠোর অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। সেনা সদস্যদের পাশাপাশি কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। কক্সবাজারে ওষুধের দোকান ছাড়া সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। জেলা সদর ছাড়া এর বাইরেও বেশকিছু এলাকায় চলছে লকডাউন।
রামু-১০ পদাতিক সেনানিবাস সূত্র জানিয়েছে, কক্সবাজারকে রেড জোন ঘোষণার পর থেকে মাঠে রয়েছেন সেনা সদস্যরা। কক্সবাজার পৌর এলাকার পাশাপাশি ৭ জুন বিকাল থেকে চকরিয়া উপজেলা পৌর এলাকা এবং উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ২, ৩, ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডকেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের ‘রেড জোন’ হিসেবে ঘোষণা করার কারণে সেনাবাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। ওই এলাকার প্রধান সড়কগুলোতে সেনা চেকপোস্ট স্থাপনের পাশাপাশি সেনা টহল কার্যক্রম বহুগুণে বাড়নো হয়েছে। এসব এলাকা পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রাখা হবে বলেও জানা গেছে।
সোমবার সকাল থেকে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথের বিভিন্ন চেকপোস্টে সেনাবাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা লক্ষ করা যায়। সেনা সদস্যরা জরুরি প্রয়োজনে চলাচলরত ব্যক্তিদের আইডি কার্ড ও পরিচয়পত্র দেখে জিজ্ঞাসাবাদ সাপেক্ষে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছেন। ছোটখাটো যানবাহন যেমন: টমটম, ইজিবাইক, অটোরিকশা চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না। সকালে পর্যটন শহরের লাবণী পয়েন্ট থেকে হলিডে মোড় হয়ে বাজারঘাটা ঘুরে ফাঁকা চিত্র দেখা গেছে। শুধু মূল সড়ক নয়, উপসড়কগুলোও আটকে দেওয়া হয়েছে। মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে শহরের বিভিন্ন স্পটে রয়েছেন সেনা সদস্যরা। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার দেখলেই থামাচ্ছেন তারা। জানতে চাচ্ছেন কেন বের হয়েছেন, কোথায় যাচ্ছেন? সদুত্তর না মিললে তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অপরদিকে, কক্সবাজারের প্রবেশমুখ লোহাগাড়া-চকরিয়া সীমানায় ইতোপূর্বেই সেনা সদস্যরা অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। জরুরি মালামাল নিয়ে আসা যানবাহনগুলোর গায়ে লেগে যেন করোনাভাইরাস জেলায় প্রবেশ না করতে পারে, সে কারণে গাড়িগুলোকে জীবাণুমুক্ত করে দিচ্ছেন তারা। এ লক্ষ্যে শহরের প্রবেশদ্বারে বিশেষায়িত একটি বুথও নির্মাণ করা হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও জেলা করোনা প্রতিরোধ সংক্রান্ত কমিটির সমন্বয়ক মো. আশরাফুল আফসার জানান, করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার বিবেচনায় প্রশাসন কক্সবাজার পৌর এলাকাকে দেশের প্রথম রেড জোন ঘোষণা দেওয়ায়, শনিবার সকাল থেকে জেলায় লকডাউন চলছে। পাশাপাশি এ নিয়ে প্রশাসন জেলার আরও কয়েকটি এলাকাকে ঝূঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
'প্রাথমিকভাবে ঝূঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে—চকরিয়া পৌর এলাকা ও ডুলাহাজারা ইউনিয়ন, টেকনাফের পৌর এলাকা এবং উখিয়ার রত্মাপালং ইউনিয়নের কোটবাজার স্টেশন সংলগ্ন আশাপাশের তিনটি ওয়ার্ড।'—বলেন আশরাফুল আফসার।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বলেন, ‘সকাল থেকে জেলার ঝূঁকিপূর্ণ এসব এলাকাকে নতুন করে রেড জোন ঘোষণা দিয়ে লকডাউন করেছে প্রশাসন। আগামী ২১ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত রেড জোন ঘোষিত এসব এলাকা লকডাউনের আওতায় থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘লকডাউনের আওতায় থাকা এসব এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ বা গণজমায়েত বন্ধ থাকার পাশাপাশি কাঁচা বাজার, মুদি দোকান, মার্কেট ও বিপণি বিতান বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে প্রশাসন। বন্ধ থাকবে ব্যক্তিগত ও যেকোনও ধরনের গণপরিবহন। এ সময় মানুষকে ঘরে অবস্থানের নির্দেশনাও রয়েছে।'
জেলা করোনা প্রতিরোধ সংক্রান্ত কমিটির সমন্বয়ক বলেন, 'শুধু ফার্মেসিসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন, কোভিড-১৯ মোকাবিলার কাজে ব্যবহৃত গাড়ি চলাচল করতে পারবে। এছাড়া রবিবার ও বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে খোলা থাকবে কাঁচা বাজার ও মুদির দোকানসহ নিত্যপণ্যের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রেড জোন ঘোষিত এলাকায় লকডাউন বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে তৎপর রয়েছে।’
এদিকে, কক্সবাজার পৌর এলাকায় প্রধান সড়কসহ উপসড়ক ও অলিগলিতে প্রথম দিনের তুলনায় বেশি সংখ্যক যানবাহন ও মানুষের চলাচল শুরু হয়েছে। খুলেছে বেশ কিছু দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রাস্তার ফুটপাতে বসেছে হকাররাও। এছাড়াও রাস্তায় বের হওয়া মানুষের দেখা গেছে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলাচল করতে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বলেন, ‘লকডাউনের নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেবে।’
উল্লেখ্য, কক্সবাজার জেলায় শনিবার (৬ জুন) পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়েছে ৯৬৪ জন। এদের মধ্যে দেশে ‘প্রথম রেড জোন’ ঘোষিত কক্সবাজার পৌর এলাকার ৩১৭ জন। জেলায় আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। এর মধ্যে কক্সবাজার পৌর এলাকার রয়েছেন ১৩ জন।








