নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে ইলিশ নিধনে ইউনিয়ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা, জেলে পরিবারের অভাব, মৌসুমি জেলেদের দৌরাত্ম্য, সাধারণ ভোক্তাদের কম দামে ইলিশ কেনার লোভ, আইনের সঠিক প্রয়োগ না করাসহ নানা কারণে সরকার ঘোষিত কর্মসূচি শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
জেলে ও মৎস্যজীবীরা জানান, তুলনামূলক বড় সংসার। ঘরে নেই দুই বেলা খাবারের ব্যবস্থা। উপরন্তু আছে কিস্তি ও ঋণের দায়। এছাড়া চলতি মৌসুমে জালে ধরা পড়েনি কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। তাই অল্প সময়ে বেশি মাছ ধরতে অসহায় জেলেরা জেল-জরিমানার ভয় উপেক্ষা করেই নদীতে মাছ শিকারে যান। কিন্তু নদীতে যাওয়ার পর অনেকেই ধরা পড়েন কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশের হাতে।
কয়েকজন জেলে জানান, নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ শিকার করে আনলে পাইকাররা কিনে নেন। আবার কোথাও কোথাও বিভিন্ন স্থান থেকে স্থানীয় লোকজন এসে খুচরা কিনে নেয়। চুরি করে ধরা ইলিশ স্পিডবোর্টযোগেও নিরাপদ স্থানে পাচারের খবর পাওয়া গেছে। নিষিদ্ধ ২২ দিন শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকেই নদীপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ পদ্ধতিতে ইলিশ বরফ দিয়ে রাখা হয়। যার প্রমাণ অভিযান শেষ হওয়ার ১২ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার সকালে বাজারে আসা বিপুল পরিমাণ সংরক্ষিত ইলিশ। যার বেশিরভাগই আগে ধরা অর্থাৎ ফ্রিজিং মাছ।
জেলে বিল্লাল হোসেন বলেন, আমার পাঁচ মেয়ে। কিস্তি আছে দুইটা। নিষিদ্ধ সময়ের আগে মাছ পাইনি। সংসারে অভাব। সরকারি সহায়তাও তেমন পাইনি। তাই মাঝে মধ্যে বাধ্য হয়েই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নদীতে মাছ ধরেছি।
বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের জেলে শরীফ বলেন, পেটের দায়ে মাছ ধরা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। সরকার ২০ কেজি চাল দিলে সেখান থেকে চেয়ারম্যান ৫ কেজি মেরে দেন। আমরা নিষেধাজ্ঞা মানতে চাই। কিন্তু পেটে ভাত না থাকলে কি করবো?
মৌসুমি জেলে রহিম বলেন, আমি কাঠমিস্ত্রির কাজ করি। এই সময়েই মাছটি আসে। ধরাও পড়ে। কিন্তু অন্য সময়ে নদীতে তেমন মাছ পাওয়া যায় না। অল্প সময়ে বেশি মাছ এ সময়েই পাওয়া যায়।
জেলে মামুনের মা লুৎফা বেগম বলেন, অনেক টাকা দেনা। ছেলেকে বলেছিলাম, বাবা আর দুই দিন আছে, নদীতে যেও না। কিন্তু নদীতে গিয়ে ধরা পড়েছে। আমাদের আট জনের সংসার। আয় করে একজনই। একবার ১৬ কেজি চাল পেয়েছি। অভাবের তাড়নায় ছেলেকে বললাম, বাবা সবাই নদীতে যায়, তুমিও যাও। দেখ কিছু পাওয়া যায় কিনা।
চাঁদপুর সদর উপজেলার তরপুরচন্ডী এলাকার গৃহবধূ জাহানারা বেগম বলেন, ‘স্বামী এতদিন নদীতে যায়নি। চার মেয়ে। তারা খাওনের জন্য কান্দে। এক মেয়ে বড়। অভাবের কারণে তাকে বিয়ে দিতে পারছি না। মেয়েকে কেউ দেখতে এলে মেহমানের সামনে তো কিছু দিতে হয়। এ অবস্থায় অভাবের কারণে স্বামীকে জোর করে নদীতে পাঠাই। কিন্তু নদীতে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই খবর পাই তাকে কোস্টগার্ড ধরে নিয়ে গেছে।
এদিকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে ২২ দিন নদীতে যাননি এমন কয়েকজন জেলে বলেন, বড় বড় ইলিশ পেতে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হলে প্রথমেই কারেন্ট জাল উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করতে হবে। জাটকা এবং মা ইলিশ রক্ষা অভিযান সফল করতে হবে। এসব অভিযান সফল করতে হলে দরিদ্র জেলেদের খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। সেই সঙ্গে অভিযান বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকেও আন্তরিক হতে হবে। সচেতন হতে হবে জেলে ও সাধারণ ভোক্তাদেরও।
চাঁদপুর মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক মানিক দেওয়ান বলেন, নিষিদ্ধ সময়ে অনেক মৌসুমি জেলে মাছ শিকার করে তা বিক্রি করেছে। শেষদিকে এসে ট্রলার, বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষণ করে অভিযান শেষ হওয়ার পরদিনই তা বাজারে এনেছে। তিনি বলেন, অভিযান সফল করতে হলে নৌ-পুলিশকে আরও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দেখা গেছে, স্থানীয় নৌ-পুলিশের ওসি ভালো। কিন্তু তার নিম্নপদস্থরা সে রকম না। কিছু জায়গায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং রাজনৈতিক পাতি নেতা নিষিদ্ধ সময়ে মাছ নিধনের সঙ্গে যুক্ত। এদের ঠিক করতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগও করতে হবে। অভিযানে জব্দকৃত যেসব জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয় তা কিন্তু মালিকেরই ক্ষতি।
চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ এ অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত। জেলেদের নদীতে নামানোর জন্য আবার অনেক দাদনদার পেছন থেকে কাজ করে। নদীতে নেমে ধরা পড়ে সাধারণ জেলেরা। কিন্তু পেছনের লোকজন ধরা পড়ে না। এছাড়া বিশাল এ নদী এলাকায় অভিযান চালানোর জন্য যে পরিমাণ জনবল, ফুয়েল, ইকুইপমেন্ট দরকার, তারও অভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, অভিযানের আগেই যদি নৌকাগুলো তালিকাবদ্ধ করে ইঞ্জিনগুলো খুলে ইউনিয়ন পরিষদে জমা দেওয়া যেতো, অভিযান শেষ হলে তারা ইঞ্জিনগুলো সেখান থেকে নিয়ে যেতো। তাহলে হয়তো এত দৌড়াদৌড়ি, ধরপাকড়ের দরকার হতো না।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আসাদুল বাকী বলেন, এ বছর মা ইলিশ নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি সফল হয়েছে। তবে জেলার ৫২ হাজার জেলের মধ্যে কিছু এলাকায় ২ হাজারের মতো জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার করেছে। তারপরও মাছের উৎপাদন স্বাভাবিক থাকবে বলে জানান তিনি।








