নোয়াখালীর জেলা শহর মাইজদীতে সাবেক স্ত্রীকে (২২) তুলে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টা ও রাতভর আটকে রেখে নির্যাতনের কারণে শারীরিক অবস্থা অবনতি হওয়ায় তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন নোয়াখালী পৌরসভার মেয়র শহিদ উল্যাহ খাঁন সোহেল।
আর্থিক সমস্যার কারণে নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারছেন না, এমন সংবাদ পেয়ে শনিবার (৭ নভেম্বর) বিকালে মেয়র শহিদ উল্যাহ খাঁন সোহেল ভুক্তভোগীর চাচার বাড়িতে তাকে দেখতে যান। পরে তিনি ওই নারীকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন এবং চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন।
অন্যদিকে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি ওই নারীর সাবেক স্বামী ইসমাইল হোসেন বাপ্পি গ্রেফতার হলেও বাপ্পির বন্ধু রহিম, আরমান ও সাগরসহ বাকি আসামিদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে ভুক্তভোগী ও তাকে আশ্রয় দেওয়া চাচার পরিবারের সদস্যদের মাঝে আতংক বিরাজ করছে।
স্বজনরা জানান, ছোটবেলায় বাবাকে হারান ভিকটিম। মা দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার করছেন। অভিভাবকহীন হয়ে নানির কাছেই বড় হন তিনি। কবিরহাট উপজেলার নবগ্রামে নানির কাছে থাকা অবস্থায় বখাটে ইসমাইল হোসেন বাপ্পির নজরে পড়েন। বাপ্পি অনেকটা জোরপূর্বক অপ্রাপ্ত বয়সেই তাকে বিয়ে করতে বাধ্য করে। কিন্তু বিয়ে করেও বাঁচতে পারেননি তিনি। প্রায় সময়ই তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হতে হতো তাকে। মারধর করতেন শাশুড়ি, ননদ ও দেবর। স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আড়াই মাস আগে স্বামী ইসমাইল হোসেন বাপ্পীকে তালাক দেন ওই নারী। নির্যাতিতা জেলা সদরের স্থানীয় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে শিক্ষানবিশ নার্স হিসাবে কর্মরত আছেন।
উল্লেখ্য, বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় নিজ কর্মস্থল থেকে হরিনারায়পুরের বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে মাইজদী পেট্রোল পাম্পের সামনে অটোরিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ভুক্তভোগী। এ সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা সামনে এসে দাঁড়ালে তিনি গন্তব্যে যাওয়ার জন্য উঠেন। গাড়িটি একটু সামনে গেলে দুজন যাত্রী সামনের সিটে ওঠেন। আরেকটু সামনে গেলে তার সাবেক স্বামী এবং আরও একজন ভিকটিমের দুই পাশে উঠে বসেন। অটোরিকশায় ওঠার পর থেকেই তার ওপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে সাবেক স্বামী বাপ্পী এবং তার সহযোগী রহিম ও আরমান। তারা চোখ-মুখ চেপে ধরে জেলার কবিরহাট উপজেলার নবগ্রামে নিয়ে যায় ওই নারীকে।
সিএনজি থেকে নামানোর পর তিনি বুঝতে পারেন এটি তার সাবেক স্বামী ইসমাইল হোসেন বাপ্পির বাড়ি। ফাঁকা বাড়িতে সাবেক শ্বশুর-শাশুড়ি কেউই ছিল না। ঘরের ভেতর একটি কক্ষে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে তাকে বেদম মারধর করে সাবেক স্বামী। রাতে নেশাগ্রস্থ অবস্থায় জ্বলন্ত সিগারেটের আগুনে মুখমণ্ডলে ছ্যাঁকা দেয় এবং অপর দুই সহযোগী ধর্ষণের চেষ্টা করে। কিন্তু নির্যাতন সহ্য করেও নিজেকে ধর্ষণ থেকে রক্ষা করেন ওই নারী। ভোরের দিকে অভিযুক্তরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে থাকার সুযোগে পালিয়ে মাইজদী চাচার বাসায় এসে আশ্রয় নেন। পরে চাচা ও স্বজনদের মাধ্যমে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় ওঠেন। সেখানেই চলছিল তার চিকিৎসা। বৃহস্পতিবার রাতে চাচার সহায়তায় সুধারাম মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন তিনি।
ছোটবেলায় বাবাকে হারানো মেয়ের এমন অবস্থায় দিশেহারা মা। বিয়ের পর দীর্ঘ চার বছর নির্যাতনের শিকার নারী তার শিশু সন্তানকে নিয়ে মাইজদীর হরিনারায়ণপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় উঠলে সেখানেও তাকে মারধর করে সন্তানকে নিয়ে যায় বাপ্পি।
সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নবীন হোসেন জানান, এ ঘটনায় নির্যাতনের শিকার ওই নারী বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে সাবেক স্বামী ইসমাইল হোসেন বাপ্পি, বাপ্পির বন্ধু রহিম, আরমান, সাগর, সিএনজি চালক এবং অজ্ঞাত আরও ৩ জনকে আসামি করে সুধারাম মডেল থানায়
মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভোর রাতে কবিরহাট উপজেলার নবগ্রাম থেকে ইসমাইল হোসেন বাপ্পিকে গ্রেফতার করে। শুক্রবার আদালতে হাজির করলে বিজ্ঞ বিচারক তাকে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।








