কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে খাদ্য সংকটে ঘোড়ার মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পক্ষ থেকে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। এদিকে এই ঘটনায় সুস্থ ও মৃত ঘোড়াগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ১৩ জনকে আইনি নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
অপরদিকে, সৈকতে একের পর এক ঘোড়া অসুস্থ ও মৃত্যুর ঘটনায় কক্সবাজার জেলার সচেতন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ঘোড়াগুলো দিয়ে মালিক নামধারী একশ্রেণির মানুষ সৈকতে পর্যটকদের বহনসহ নানা সেবার অজুহাতে ব্যবসা করে বিপুল অর্থ আয় করেছে। কিন্তু, আজ করোনার সংকটে ঘোড়াগুলোকে অর্থ সংকটের অজুহাতে রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছে। এ কারণে রাস্তার ময়লা-আবর্জনা খেয়ে অসুস্থ হয়ে ঘোড়াগুলোর মৃত্যু হচ্ছে। তাই, ঘোড়াগুলোকে খাদ্য সহায়তার দেওয়ার আগে ঘোড়ার মালিকদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
গত দুই মাস করোনার দ্বিতীয় ঢেউতে সংক্রমণ রোধে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটক নিষিদ্ধ থাকায় অর্থ সংকটে পড়ে ঘোড়া মালিকরা। এতে করে ঘোড়ার প্রয়োজনীয় খাদ্য সংকট ও নানা কারণে ঘোড়াগুলো অসুস্থ এবং মৃত্যু হচ্ছে। চলতি বছরে খাদ্য সংকট ও নানা কারণে ছয়টি ঘোড়া মারা যায়। এই ঘটনায় কক্সবাজারসহ সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. অসীম বরণ সেন বলেন, ‘খাদ্য সংকটে পড়ে ঘোড়া মারা যাওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। এরপরও বিভিন্ন মিডিয়ায় খবরটি আসার পর প্রাণিসম্পদ অধিদফতর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। কমিটিতে কক্সবাজার প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. নেবুলাল দত্তকে প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন– কক্সবাজার প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের উপ-সহকারী কর্মকর্তা ডা. মিজবাহ উদ্দিন কুতুবী ও ডা. এহসানুল হক।’
তিনি আরও বলেন, ‘লকডাউনের পর থেকে দ্বিতীয় দফা ঘোড়া মালিকদের ঘোড়ার জন্য ভূষি ও প্রয়োজনীয় খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু, খাদ্যাভাবে মৃত্যুর ঘটনাটি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন মনে করে আমার অফিস। তাই, তদন্ত কমিটি খাদ্য সংকট আছে কিনা, কতটি ঘোড়ার মৃত্যু হয়েছে এবং অসুস্থ কতটি ঘোড়া, সবদিক অনুসন্ধান করবে।’
কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া আকতার সুইটি বলেন, ‘করোনায় লকডাউনে অসহায় মানুষের খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি কক্সবাজার সৈকতের ঘোড়াগুলোর জন্য পশুখাদ্য হিসেবে মালিকদের ভূষির বস্তা বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে দ্বিতীয় দফা ভূষি বিতরণ করা হয়েছে। সব মিলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়েছে প্রশাসন।’
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে কোনও ঘোড়া চলাচল করতে পারবে না। কারণ, এসব ঘোড়া সমুদ্র সৈকতে মলত্যাগের মাধ্যমে পরিবেশ দূষিত করে এবং পর্যটকদের অবাধ চলাচলের ওপর বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়াও ঘোড়ার মালিকরা ঘোড়াকে পুঁজি করে পর্যটকদের কাছ থেকে গলাকাটা বাণিজ্য করে। এ নিয়ে অসংখ্য অপ্রীতিকর ঘটনার ঘটেছে। তাই এসব ঘোড়ার মৃত্যু, অসুস্থতাসহ নানা কারণের জন্য প্রধানত দায়ী মালিকরা।’ তাই, ঘোড়ার মৃত্যুর জন্য এসব মালিকদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সমুদ্র সৈকতে ঘোড়া চলাচলের উপর নিষিদ্ধ করার দাবি জানান এই পরিবেশ সংগঠক।
‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন বলেছেন, ‘পশুগুলোর উপর মালিকপক্ষের অমানবিক আচরণে আমরা ক্ষুব্ধ। মালিকরা এতদিন ধরে ঘোড়াগুলোকে দিয়ে টাকা আয় করেছে। আজ করোনা সংকটে ঘোড়াগুলোতে দূরে ঠেলে দিয়েছে। তাই, ঘোড়া মালিকদের গ্রেফতার না করে খাদ্য সহায়তা দুঃখজনক। এসব রোগাক্রান্ত ঘোড়া করোনাসহ বিভিন্ন রোগ ছড়ায়। সমুদ্রসৈকত দূষিত করে। এই ঘোড়াগুলো সরকারি হেফাজত বা কোনও পার্কে রাখার দাবি জানাচ্ছি।’
এদিকে, কক্সবাজার ঘোড়া মালিক সমিতির সভাপতি আহসান উদ্দিন নিশান বলেন, ‘লকডাউনে ঘোড়া মালিকরা খুবই বেকায়দায় রয়েছে। ঘোড়াগুলোকে দৈনিক প্রয়োজনীয় খাবার জোগান দিতে না পেরে এবং নানা কারণে চলতি বছরে ছয়টি ঘোড়া মারা গেছে। প্রতিটি ঘোড়ার মূল্য ৪৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। মারা যাওয়ার পেছনে ঘোড়ার খাদ্য সংকটসহ নানা কারণ রয়েছে। এই খাদ্য সংকটে পড়ে কিছু মালিক ঘোড়া শহরে ছেড়ে দিয়েছে। এজন্য নানা কারণে এসব ঘোড়ার মৃত্যু হয়েছে।’
এদিকে, খাদ্য সংকটে ঘোড়ার মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ১৩ জনের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও বেলার নিযুক্ত আইনজীবী সাঈদ আহমেদ কবীর স্বাক্ষরিত লিগ্যাল নোটিশে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের সভাপতি, কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, কক্সবাজার পুলিশ সুপার, কক্সবাজার পৌর মেয়র, কক্সবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, কক্সবাজার সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, কক্সবাজার পরিবেশ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ও কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম রয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক মহামারি সংকটকালীন সময়ে পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় কক্সবাজারে বছরব্যাপী আর্থিক জোগানের উৎস এ ঘোড়া খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছে। সম্প্রতি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ঘোড়াগুলো খাবারের অভাবে দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। খাদ্যের অভাবে ঘোড়াগুলো রাস্তার পাশে ফেলা প্লাস্টিক বা পলিথিন বর্জ্য খেয়ে ফেলছে। যার কারণে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার শিকার হচ্ছে। দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনও প্রাণীকে প্রয়োজনীয় খাদ্য প্রদান না করা এবং অসুস্থ অবস্থায় লোকালয়ে মুক্ত করে দেওয়া প্রাণীর প্রতি অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং তা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ অবস্থায় নোটিশের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) এবং পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়ার্ল্ডফেয়ার ফাউন্ডেশন (পিএডব্লিউ) অনতিবিলম্বে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে বিদ্যমান ঘোড়া, ঘোড়ার মালিক ও তত্ত্বাবধায়কদের তালিকা প্রস্তুত করে জীবিত ও সুস্থ ঘোড়াগুলোর জন্য নিরাপদ আবাসন ও খাদ্য নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে অসুস্থ ঘোড়াগুলোকে আটক করে সরকারি ভেটেরিনারি হাসপাতালে চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্য পাঠানোর অনুরোধ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে গৃহীত বিষয়াদি অবহিত করার অনুরোধ করা হচ্ছে। অন্যথায় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণরোধে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো নিষিদ্ধ করে স্থানীয় প্রশাসন। এ অবস্থায় খাদ্য সংকটে পড়ে সৈকতে পর্যটকদের জন্য বিনোদন দেওয়া ঘোড়াগুলো। এতে করে মালিকদের পক্ষে ঘোড়াগুলোকে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত খাবার জোগান দিতে না পেরে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছরে মারা গেছে ছয়টি ঘোড়া। বর্তমানে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ৫৫টি ঘোড়া রয়েছে। এসব ঘোড়া মালিকদের ২২ সদস্য বিশিষ্ট ‘কক্সবাজার ঘোড়া মালিক সমিতি’ নামে একটি সমিতি রয়েছে।
আরও খবর: কক্সবাজার সৈকতের ৬ ঘোড়ার মৃত্যু








