কিডনি রোগী মায়ের ডায়ালাইসিস ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারাগারে যাওয়া মো. মোস্তাকিমের বিরুদ্ধে করা পুলিশের মামলা প্রত্যাহার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করা হয়েছে।
সোমবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এবং ই-মেইলের মাধ্যমে মোস্তাকিম স্বাক্ষরিত আবেদনপত্রটি পাঠানো হয়। একই আবেদনপত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার বরাবরও পাঠানো হয়েছে। আবেদনে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনায় বিচার দাবি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন মোস্তাকিম।
আবেদনে বলা হয়, ‘আমি জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসায় ফাজিল তৃতীয় বর্ষ ও সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আমার সংসারে কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী মা ও একজন প্রতিবন্ধী বোন রয়েছে। মায়ের সপ্তাহে তিনবার কিডনি ডায়ালাইসিস করাতে হয়। এজন্য যে অর্থের প্রয়োজন তা জোগাড় করতে আমাকে তিন-চারটি টিউশনি করতে হয়। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ডায়ালাইসিস ফি ৫৩৫ টাকা থেকে দুই হাজার ৯৩৫ টাকা করা হয়। গত ১০ জানুয়ারি ডায়ালাইসিস রোগী ও রোগীর স্বজনদের শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে অংশ নিই। এ সময় পাঁচলাইশ থানার ওসি নাজিম উদ্দিন মজুমদারের নেতৃত্বে পুলিশ একটি ফোর্স আমাদের ওপর চড়াও হয় । ওসি আমার কিডনি রোগী মাকে লাথি মেরে ফেলে দেন। ওসি ও পুলিশ সদস্যরা আমাকে বেধড়ক মারধর করে ও টেনেহিঁচড়ে মারতে মারতে থানায় নিয়ে যান। পরে হেফাজতে ওসির নির্দেশে কোমরের নিচে হাত বেঁধে কালো লাঠি দিয়ে পিটিয়ে জখম করা হয়। একপর্যায়ে আমি যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকি। বাঁ হাতের কবজি ও হাঁটু ফুলে যায়। এ অবস্থায় আমিসহ ৫০-৬০ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে পাঁচলাইশ থানায় মামলা করে পুলিশ। পাঁচ দিন হাজতবাসের পর জামিনে মুক্তি পাই।’
আবেদনে মোস্তাকিম আরও লিখেছেন, ‘নির্যাতনের অভিযোগ করলে পাঁচলাইশ থানার ওসি শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাকে সাজানো বলে দাবি করেন। অথচ আমাকে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক শারীরিক নির্যাতনের ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন। এছাড়া ঘটনাস্থলে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার কোনও ছবি কিংবা ভিডিও ফুটেজ পায়নি পুলিশ। তবে ছবি ও ভিডিওতে মাকে লাথি মারার এবং আমাকে নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘অন্যায়ভাবে আমাকে ও ডায়ালাইসিস রোগীদের ওপর অত্যাচারকারী পুলিশ সদস্য এবং ঘটনার নেতৃত্বদানকারী ওসির শাস্তি দাবি করছি। পাশাপাশি আমি এবং আমার পরিবারকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ অবমাননাকর আচরণের ক্ষতিপূরণ দাবি করছি। সেইসঙ্গে আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।’
আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করে মোস্তাকিমের আইনজীবী জিয়া হাবিব আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশের দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, পুলিশ হেফাজতে মারধর ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য এই আবেদন করা হয়েছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মো. মোস্তাকিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়ার পর আমি ভয়ে আছি। ঘর থেকে বের হয়নি। আমার বিরুদ্ধে মামলা তো দূরে থাক কখনও কারও বিরুদ্ধে মামলা করিনি। আমার বিরুদ্ধে করা মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাই। সেইসঙ্গে ক্ষতিপূরণ চাই।’
প্রসঙ্গত, ১ জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বাড়ানো হয়েছে ডায়ালাইসিস ফি। এ নিয়ে কয়েকদিন ধরে ফি কমানোর দাবিতে আন্দোলন করেছেন ডায়ালাইসিস সেবা গ্রহণকারী রোগী ও তাদের স্বজনরা। আন্দোলন থেকে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে করা মামলায় ১০ জানুয়ারি গ্রেফতার হন মোস্তাকিম। তিনি নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার জালালাবাদ অক্সিজেন এলাকার মৃত খালেদ আজমের ছেলে। চট্টগ্রাম জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসায় ফাজিল ক্লাসে পড়ার পাশাপাশি হাজী মুহাম্মদ মুহসীন কলেজে ইসলামের ইতিহাসে অনার্স করছেন মোস্তাকিম। পুলিশের দায়ের করা ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে পরদিন বুধবার কারাগারে পাঠানো হয়। চার দিন পর কারাগারমুক্ত হন।









