ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধকে কেন্দ্র করে গত ১ জানুয়ারি থেকে জেলা ও দায়রা জজ শারমীন নিগার এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ ফারুক আহমেদের অপসারণ দাবিতে কয়েক দফা আদালত বর্জন করে আসছেন জেলার আইনজীবীরা।
বুধবার (৮ ফেব্রুয়ারি) আরও এক সপ্তাহের জন্য জেলার সব আদালত বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন আইনজীবীরা। তবে আদালতের কার্যক্রম সচল থাকায় বিচারপ্রার্থীরা আইনজীবী ছাড়াই এজলাসে সরাসরি এসে বিচার প্রার্থনা করছেন এবং প্রতিকারও পাচ্ছেন। এদিকে সকাল থেকে বিচারপ্রার্থীরা আদালতে আসতে চাইলে তাদের পথে আটকে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। এ ঘটনাকে বেআইনি এবং অধিকারে হস্তক্ষেপের শামিল বলে মনে করছেন আদালত কর্মকর্তারা।
বুধবার সকালে সরেজমিন আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়, জেলা ও দায়রা জজ শারমীন নিগার এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ ফারুক আহমেদের অপসারণ দাবিতে আইনজীবীদের কর্মবিরতি চলছিল। এরইমধ্যে সকাল থেকে বিচারপ্রার্থীরা আসছিলেন আদালত ভবনে। আইনজীবী ছাড়াই তারা আদালতে বিচার চাইতে যাচ্ছিলেন। তবে আদালত ভবনে প্রবেশের সময় সিঁড়িতেই বিচারপ্রার্থীদের পথরোধ করে তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন কয়েকজন আইনজীবী। একপর্যায়ে আগত বিচারপ্রার্থীদের আদালত ভবন থেকে সরিয়ে দেন তারা।
বিচারপ্রার্থীদের একজন সালমা আক্তার। সকালে চার শিশু সন্তানকে নিয়ে তিনি তৃতীয় তলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ ফারুক আহমেদের আদালতে যাচ্ছিলেন। আইনজীবী ছাড়া বিচারপ্রার্থী হওয়ায় তার পথরোধ করেন আইনজীবী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বশির আহমেদ খানসহ আন্দোলনরত একাধিক আইনজীবী। আদালত পুলিশের সামনেই এ ঘটনা ঘটে।
সালমা জানান, তার স্বামী কাউসারকে নিয়ে তিনি শহরের দাতিয়ারা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। কাউছারের সাথে প্রতিবেশী আমিনা খাতুনের তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিরোধ ছিল। বিরোধের জের ধরে আমিনা খাতুন তার শিশু ছেলেকে ধর্ষণের অভিযোগ এনে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর কাউছারকে প্রধান আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেন। এই মামলায় গ্রেফতার হয়ে তিনি কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন।
তিনি আরও জানান, মামলাটিতে গত বছরের নভেম্বরে বাদী পক্ষের সাথে আপস মীমাংসা হয়েছে। মাঝখানে ডিসেম্বর মাসে শীতকালীন বন্ধ থাকায় তিনি আপসনামা আদালতে দাখিল করতে পারেননি। জানুয়ারি মাস শুরু হলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর আদালতে আইনজীবীরা না আসায় সেই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় বিনা বিচারে গত ৬ মাস ধরে তার স্বামী কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
এরইমধ্যে তিনি জানতে পারেন আইনজীবী ছাড়াই আদালতে বিচার কাজ চলছে। খবর পেয়ে আজ সকালে আইনজীবী ছাড়াই তিনি চার শিশু সন্তানকে নিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ আদালতের বিচারকের কাছে যাচ্ছিলেন। এসময় আদালত ভবনে আসামাত্র জেলা আইনজীবী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বশির আহমেদ খাঁন তাকে জোরপূর্বক আদালত ভবন থেকে নামিয়ে দেন। এ ঘটনায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে সালমা বলেন, আমি অনেক কষ্ট করে চার শিশু সন্তান নিয়ে স্বামী ছাড়া চলতেছি। স্বামী ছাড়া পরিবারে রোজগার করার মতো কেউ নেই। আমরা দিন এনে দিন খাই। গত ৬ মাস ধরে স্বামী জেলে থাকায় ঘর ভাড়াও দিতে পারছি না। নিজের মামলা নিয়ে নিজেই আদালতে এসেছিলাম। জজ সাহেবের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করে বলতাম জামিনের কথা। উকিল আমাকে উপরে যেতে দেয়নি। পিপি সাহেব সাইন দিলে জামিন হয়ে যেতো। তিনিও সাইন দেননি। এখন আমি আমার স্বামীকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে চাই। বিচার চাই।
এদিকে সালমার মতো অনেক বিচারপ্রার্থী বিচার না পেয়ে আদালত থেকে ফিরে যাচ্ছেন। মো. হাসিফ মিয়া নামে আরেক বিচারপ্রার্থী বলেন, অনেক দিন ধরে একটি মামলা নিয়ে ঘুরতেছি। একসময় জজ সাহেবকে পাই না, অন্য সময় আইনজীবীদের কোর্ট বর্জন থাকে। এ কারণে আমরা যারা সাধারণ মানুষ মামলা নিয়ে আদালতে আসি তারা খুবই হয়রানির শিকার হচ্ছি। অর্থনৈতিকভাবেও আমরা ক্ষতির শিকার হচ্ছি। অন্য কাজকর্ম রেখে আদালতে আসতে হয়। হাইকোর্ট যদি এ বিষয়টা একটু দেখে উভয় পক্ষের মধ্যে সমন্বয় করে দেন তাহলে আমাদের অনেক উপকার হয়।
বাঞ্ছারামপুর থেকে আসা হোসেনা আক্তার নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, আমার স্বামীর একটি গাড়ির মামলা ছিল। এই গাড়ি চালিয়েই আমাদের সংসার চলে। মামলা নিয়ে কয়েকবার আদালতে আসছি। একেকবার একেক তারিখ দেয়। প্রতিবার উকিলকে টাকা দিয়ে যাই। কিন্তু মামলার কোনও সুরাহা হচ্ছে না। আজকে আসার পর আবার ১৬ তারিখে আসার কথা বলেছে। এতদূর থেকে গাড়ি ভাড়া দিয়ে এসে এখন আবার ফিরে যেতে হচ্ছে—এর একটা সমাধান না হলে আমরা বারবার হয়রানির শিকার হবো।
বিচারপ্রার্থীদের বাধাদানকারী আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বশির আহমেদ খান বলেন, আমরা আন্দোলনের ডাক দিয়েছি। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। যতদিন আমাদের দাবি আদায় না হবে ততদিন আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আদালতে যেন কোনও কার্যক্রম না চলে সেজন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আইনজীবী ছাড়া বিচার কাজ সম্ভব নয়, সেটা আমরা জনগণকে বুঝানোর চেষ্টা করছি।
অপর দিকে আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, বিচারপ্রার্থীকে বাধা দেওয়া একেবারে বেআইনি এবং অধিকারের হস্তক্ষেপের শামিল। আইনজীবী ছাড়া বিচার কাজ চলে এবং চলছে। এটা আইনেই সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। আইনজীবী ছাড়া বিচার কার্যক্রম চলতে আইনে কোনও বাধা নেই। বিচারপ্রার্থীরা যদি আইন সম্পর্কে জেনে বিচারককে তাদের বিষয়টি বুঝাতে পারেন তাহলে আইনজীবীর প্রয়োজন হয় না।
এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর কোর্ট পুলিশের উপ-পরিদর্শক বেলাল হোসেন বলেন, সামনা-সামনি আমরা কিছু দেখিনি। তবে আদালতের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য আমরা সচেষ্ট আছি। তবে যদি কেউ কাউকে ভয়ভীতি দেখায় তাহলে বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তানভীর ভূঞা বলেন, আইনমন্ত্রী মহোদয় বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছেন। আমরা মনে করি উনি কোনও কারণে অপারগ হয়েছেন। সেজন্য আমরা আমাদের আগের জায়গায় ফিরে গিয়েছি। আমরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
জেলা আইনজীবী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১৫ হাজার বিচারপ্রার্থী মোট ২৩টি আদালতে মামলাজনিত কারণে আসা-যাওয়া করে থাকেন।









