‘১৯৭২ সাল। পড়ন্ত বিকেলে আপন মনে ভেসপা চালিয়ে যাচ্ছি। শাসনগাছা রেললাইনের কাছে আসতেই চোখে পড়ে এক হলদে কাপড় পরা সেনা কর্মকর্তার। রেল ক্রসিংয়ে ভেসপা নিয়ে আটকে পড়ে আছে। কাছে গিয়ে ভেসপাটা উঠিয়ে তাকে হাত ধরে উঠালাম। সেদিন থেকে বন্ধুত্বের শুরু। এরপর ৫১ বছর পেরিয়ে গেছে। আমি একপেশে ভালোবাসায় নিজেকে জিতিয়ে রেখেছি। জানি না সে কেমন আছে? তাকে ভীষণ মনে পড়ে।’ কথাগুলো বলতে বলতে অশ্রুসিক্ত হন কুমিল্লার জামিল আহমেদ খন্দকার।
মঙ্গলবার ভালোবাসা দিবসের সন্ধ্যায় বন্ধুত্বের গল্প শুনতে জামিল আহমেদের বাড়িতে যাওয়া। জামিল কুমিল্লা নগরীর তালপুকুর পাড় এলাকার আবদুল মতিনের ছেলে ও পুরনো পরিবহন ব্যবসায়ী।
১৯৭২ সালে এক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় তার। জামিল জানান, ১৯৭২ সালের কোনও এক বিকালে ওই সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা হয় তার। নাম রণজিৎ সিং। ভারতের পূর্ব পাঞ্জাবের বাসিন্দা এই রণজিৎ। কর্মরত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিগন্যালস কোরের লেফটেন্যান্ট হিসেবে।
জামিল বলেন, ‘তখন কুমিল্লায় চীনের এক ধরনের কলম ভালো বিক্রি হতো। বেশ দামি ও সৌখিন। দুদিন পর কলম কিনতে গেলাম। তখন দেখি রণজিৎ কলম কিনতে এসেছে। তাকে কলম কিনে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে তার টমছম ব্রিজ এলাকার ক্যাম্পে চায়ের দাওয়াত দেয়। এরপর থেকে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর টমছম ব্রিজ ক্যাম্পে যাওয়া শুরু।
‘এরপর ১৯৭২ সালের মার্চ কিংবা এপ্রিলে রণজিৎ আমাকে জানায় পাঞ্জাব যাবে ছুটি কাটাতে। আমি যেন তার সঙ্গে যাই। আমার ১০ ভাই ও এক বোন মারা যাওয়ার পর যখন আমি যুদ্ধে যাই আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমি ছাড়া আর কেউ ছিলো না মায়ের পাশে। যে কারণে রণজিতের সঙ্গে তার বাড়ি যেতে পারিনি।’
বন্ধুর স্মৃতিচারণ করে জামাল বলেন, ‘কিছুদিন পর রণজিৎ আবার কুমিল্লায় আসে। তাকে আমার বাড়িতে দাওয়াত দিই। সে জুন বা জুলাইয়ের দিকে আমার বাড়িতে আসে।’
রাতে এক বিস্ময়কর ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম উল্লেখ করে জামিল বলেন, ‘গল্প করতে করতে রাত ১২টা বেজে গেলো। রণজিৎ হঠাৎ আয়নার সামনে চলে গেলো। মাথা থেকে পাগড়িটা খুলতেই হাঁটু পর্যন্ত নেমে এলো মাথার চুল। এমন দৃশ্য এর আগে কখনও দেখিনি।’
তাকে এখনও মনে করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বন্ধুত্বের আসলে কোনও কারণ থাকে না। একজন মানুষের সঙ্গে কত কাছের সম্পর্ক হয় তা লিখে বা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। অন্য ধর্মের, অন্য দেশের, অন্য ভাষার অথচ সে আমার সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতো। তার ভালো লাগা আমার সঙ্গে ভাগাভাগি করতো, কষ্টে থাকলে আমাকে বলতো।’
স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘তখন ভারতে একটি সিনেমা খুবই হিট হয়। নাম ছিল হাতি মেরা সাথী। মুভির নামে টি-শার্ট, শার্ট, পারফিউমসহ নানা ধরনের ফ্যাশনেবল জিনিস মার্কেটে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছিলো। রণজিৎ বাড়িতে গিয়ে ফেরার সময় আমার জন্য সেসব নিয়ে আসে।’
কখন থেকে যোগাযোগ বন্ধ এমন প্রশ্নে জামিল বলেন, ‘বয়স এখন ৭২। বন্ধুর বয়সও ৭২। অতটা মনে নেই। ভেবেছিলাম কখনও বিচ্ছেদ হবে না, তাই কোনও কিছু সংরক্ষণ করিনি। ভারতীয় মিত্রবাহিনী দেশ ছাড়ার পর আমার সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। তখন চিঠি চালাচালি হতো। ভালো লাগা, খারাপ লাগা সব চিঠিতেই লিখতাম। পরে ১৯৭৬ সালের দিকে টেলিফোন কিনি। আমি চিঠিতে নম্বর দেওয়ার পর আমাকে কল দেয়। তখন প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার কথা হতো। সম্পর্ক আরও গভীর হতে লাগলো। ১৯৭৬ সালে আমি বিয়ের দাওয়াত দিই রণজিৎকে। কিন্তু চাকরিতে থাকায় আসতে পারবে না বলে জানায়। তবে আমাদের জন্য শুভেচ্ছা পাঠায়। কিছুদিন পর সে বাংলাদেশে আসে। তখন আমার বাড়িতে খোঁজ করেছিল। কিন্তু আমি কুমিল্লার বাইরে থাকায় আর দেখা হয়নি।
‘এরপরও তার সঙ্গে কথা হয়। পরে বাড়ি পরিবর্তন করার সময় তার সঙ্গে যোগাযোগ কিছুটা কমে যায়। আমি চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। টেলিফোনে কল যাচ্ছিল না। তখন ১৯৮১ কিংবা ৮২। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। রণজিৎ কেমন আছে জানি না। প্রিয় বন্ধুকে কতটা মিস করি বলে বোঝানো সম্ভব নয়। প্রতিবার যখন ভেসপায় উঠি তার কথা মনে পড়ে।’









