কুমিল্লায় হাসপাতাল ও চিকিৎসকের অবহেলায় ১৭ মাসের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকার আল নূর হাসপাতালে গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে ওই শিশু মারা গেছে। পরে বিষয়টি নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসক ও হাসপাতালের অবহেলার তথ্য পাওয়া গেছে।
অস্ত্রোপচারের সময় মারা যাওয়া ওই শিশু এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। শুধু ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা করেই তার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। কুমিল্লার বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, সিভিল সার্জন কার্যালয় ও অ্যানেস্থেসিয়ায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
তারা বলছেন, অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার পর ওই শিশুর জরুরি অবস্থার জন্য কোনও পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না হাসপাতালে। ছিল না জরুরি অবস্থায় ব্যবহার করার কিংবা বোঝার কোনও যন্ত্র। এতে শিশুর অবস্থার অবনতি বুঝতেও দেরি হয়েছে চিকিৎসকের। আর অবনতি দেখেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। যার নিশ্চিত ফলাফল মৃত্যু।
বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এই হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের অবহেলার চিত্র ওঠে এসেছে।
শিশু নূর মোহাম্মদ (১৭ মাস) কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর পশ্চিম পাড়ার সবুজ মিয়া ও তানিয়া আক্তার দম্পতির সন্তান।
হাসপাতালের অবহেলা—
কুমিল্লার অন্তত পাঁচ জন অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করা শর্তে প্রত্যেকেই বলেন, প্রত্যেক রোগীকে অপারেশনের আগে অ্যানেস্থেসিয়ার চিকিৎসক এটা নিশ্চিত হতে হবে, যাকে অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়া হচ্ছে তার কী জ্ঞান ফিরবে? যদি না ফেরে কীভাবে ফেরাবেন? তখন তার কী কী যন্ত্রপাতি লাগবে? রোগীর জরুরি অবস্থার জন্য কী পদক্ষেপ নেবেন? তা ওই হাসপাতালে আছে কি না? অস্ত্রোপচারের আগেই অ্যানেস্থেসিয়া ও অস্ত্রোপচারের চিকিৎসককে নিশ্চিত হতে হবে। এই শিশুর অস্ত্রোপচারে আরও দুই বছর কিংবা তার বেশি সময় নিলেও কোনও ক্ষতি হতো না। কিন্তু পরিবারের চাপে কিংবা অন্য কারণে যেই হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ওই হাসপাতালে কোনও কার্ডিয়াক মনিটর (হৃৎপিণ্ডের কার্যকলাপ দেখার যন্ত্র) ও শিশুদের পালস অক্সিমিটার (হৃৎস্পন্দন ও শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা মাপার যন্ত্র) ছিল না। এতে চিকিৎসক রোগীর হৃৎপিণ্ডের অবস্থা জানতে দেরি হতে পারে। যেহেতু কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে সুতরাং এই রোগীর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল।
চিকিৎসক ও হাসপাতাল রোগীর কী ব্যবস্থা নিতে পারতো- এমন প্রশ্নে চিকিৎসকরা বলেন, প্রথমত যদি যন্ত্রগুলো থাকতো ওই রোগীর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হওয়ার আগেই ডাক্তার বুঝতে পারতেন। এতে তাকে দ্রুত এনআইসিইউতে বা বিশেষ প্রয়োজনে আইসিইউতে নিতে পারতেন। কিন্তু ক্লিনিক্যালি স্টেথোস্কোপের সাহায্যে চিকিৎসক যতক্ষণে বুঝেছেন তা হয়তো দেরি হয়ে গেছে। আর সেখানে কোনও এনআইসিইউ বা আইসিইউ ছিল না। সুতরাং চেষ্টা করেও কোন লাভ হতো না। কারণ চিকিৎসকের কথা অনুযায়ী ওই শিশুর হাতে সময় বেশি ছিল না। সুতরাং আশপাশের যে হাসপাতালে এনআইসিইউ ছিল সেখানে নেওয়ার পথেই মারা যেতো। তাই অপ্রস্তুত ও পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া এভাবে একটা শিশুকে এত বড় অস্ত্রোপচারের জন্য এমন হাসপাতালে নেওয়া একেবারে উচিত ছিল না।
চিকিৎসকের অবহেলা—
ওই শিশুর মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টকে। যা হার্টের সমস্যা থেকেও হতে পারে। মারা যাওয়া ওই শিশুর আত্মীয় স্বজন ও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার হাইপোস্পোডিয়াস (মূত্রনালির সহজাত অপগঠন যার ফলে মূত্ররন্ধ্র শিশ্নের মাথায় না থেকে নিচের দিকে থাকে) ছিল। যা জন্মগত। একটি জন্মগত সমস্যা থাকলে আরও থাকতে পারে জেনেও চিকিৎসকরা কখনও তার হার্টের অবস্থা জানার জন্য কোনও পরীক্ষা দেননি। এতে অস্ত্রোপচার চলাকালে তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
কুমিল্লা শহরে প্রায় ১৫ বছর অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে যাচ্ছেন ডা. মো. আলতাফ হোসেন চৌধুরী (শাহিন)। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘২০০৮ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত কত হাজার রোগীকে অ্যানেস্থেসিয়া দিয়েছি তার কোনও হিসেব নেই। তবে একটা বিষয় অনুভব করেছি, এই কাজ খুবই স্পর্শকাতর। একটু ভুলেই বড় কিছু হতে পারে। সাধারণত যদি কারও একটি জন্মগত ত্রুটি থাকে তাহলে এটা খুব সহজ বিষয় যে তার আরও জন্মগত ত্রুটি থাকতে পারে। বিশেষ করে হার্টে। ওই শিশুর ক্ষেত্রেও তা হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যারা সাধারণ অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে থাকি আমরা রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলি। তার কোনও হার্টে সমস্যা ছিল কি না? বা তারা কোনও উপসর্গ পেয়েছে কি না। রোগীর স্বজনরা হ্যাঁ উত্তর দিলে ব্যবস্থা নিই। কারণ হার্টে সমস্যা নিয়ে অস্ত্রোপচারে ঝুঁকি থাকে। ওই শিশুর ক্ষেত্রে হার্টে সমস্যার কথা মাথায় রেখে একটা ইকোকার্ডিওগ্রাম করলে ভালো হতো। যদিও কুমিল্লাতে এটি খুব বেশি নেই যেগুলো আছে তাও ব্যয়বহুল। যদি এই পরীক্ষা করাতে পারতেন এতে চিকিৎসকও নিশ্চিত হতে পারতেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক চিকিৎসক বলেন, ‘আমি বলবো না হার্টে সমস্যার কারণে ওই শিশু মারা গেছে। তবে ইকোকার্ডিওগ্রাম করা উচিত ছিল। এতে বিপদ থাকতো না।’
এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘যে চিকিৎসক অ্যানেস্থেসিয়া দিয়েছেন তিনি একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। নিশ্চয়ই তিনি বুঝে দিয়েছেন। তবে এটা নিশ্চিত যে ওই মেডিসিন শরীরে প্রবেশ করার সময় পরিমাণে কম বেশি হলে মৃত্যু ঝুঁকি থাকে। এটাতে কোনও সন্দেহ নেই।’
বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে যদি ওই হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার এই অস্ত্রোপচারের জন্য যোগ্যই না হয় তাহলে চিকিৎসকরা কেন সেখানে এই অপারেশন করলেন, অভিভাবকরাও কেন সেখানে নিয়ে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে একই রকম জবাব।
রোগীর স্বজনরা যা বলছেন—
শিশু নূর মোহাম্মদের মা তানিয়া আক্তার বলেন, ‘২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ডা. দেবাশীষ চক্রবর্তীর কাছে চিকিৎসার জন্য যাই। তখন থেকে আমরা ওনার কাছে সেবা নিয়ে আসছিলাম। ডাক্তার আমাদের বললেন, তিনি মুক্তি হাসপাতালে অপারেশন করতে চান। সেখানে খরচ বেশি দেখে আমরা অপেক্ষা করছিলাম কম খরচে কোথাও করার। এ সময় আমার দূর সম্পর্কের মামা হেলাল উদ্দীন এসে আমাদের বলেন উনি কম খরচে করিয়ে দেবেন। পরে নিয়ে আসা হয় আল নূর হাসপাতালে। এখানেই আমার বাচ্চার জীবন শেষ।’
চিকিৎসকরা যা বলছেন—
এদিকে ডা. দেবাশীষ চক্রবর্তী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা পূর্বেই বলেছি, মুক্তি হাসপাতালে অপারেশন করতে। সেখানে সব যন্ত্রপাতিও আছে। সেই অপারেশন থিয়েটার এই অপারেশনের জন্য ঠিক ছিল। কিন্তু রোগীর আত্মীয়রা এখানেই করবেন বলে জানান। আমাদের কী করার!’
অপারেশনের আগে রোগীর হার্টের অবস্থা জানা উচিত ছিল কি না এমন প্রশ্নে এই চিকিৎসক বলেন, ‘আমরা চেকআপ করেছিলাম। বাচ্চাদের ইকো কুমিল্লায় খুব কম হয়। আর রোগীর আত্মীয়রা বলেছিল, তার সমস্যা নেই। তাই আর পরীক্ষা করাইনি। তাছাড়া এখানে আমার কী দোষ? আমি অপারেশন করি, তাই করেছি। আমার অপারেশনে কোনও সমস্যা হয়নি। অপারেশনের শেষে তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে। এটা সিভিল সার্জন অফিস দেখবে।’
অ্যানেস্থেসিয়া সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি আছে কি? তার হার্টের অবস্থা ঠিক ছিল কি না- এসব দেখা হয়েছে কি না? এমন প্রশ্নে অ্যানেস্থেসিয়ার চিকিৎসক ফখরুল আজম বলেন, ‘টেস্ট দেবে সার্জারির ডাক্তার। উনি দিয়েছেনও। আমি রিপোর্ট দেখেছি। সব ঠিক ছিল। কিন্তু আমরা ইকো করাইনি এটা সত্যি। তার হার্টে কোনও সমস্যা ছিল না। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে যে কেউ মারা যেতে পারেন।’
তিনি বলেন, ‘তাছাড়া আমি ক্লিনিক্যালি স্টেথোস্কোপ দিয়ে দেখছিলাম। তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হওয়ার ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ডের মধ্যেই আমি বুঝেছি। কিন্তু তখনও সময় ছিল। আমি রোগীর আত্মীয়কে বুঝিয়েছি। ওনারা আমার কথা অন্যভাবে নিয়ে লোক জড়ো করেছেন। তাকে এনআইসিইউতে নেননি।’
শিশুর স্বজনরা যদি তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নিতেন তাহলে কী ওই শিশুকে বাঁচানো সম্ভব ছিল? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তার হাতে কয়েক মিনিট ছিল। কিন্তু এনআইসিইউ হাসপাতালে অনেক দূরে ছিল। তবুও চেষ্টা করা যেত।’ এই চিকিৎসকও স্বীকার করেছেন সেই হাসপাতালে শিশুদের পালস অক্সিমিটার ছিল না। যাতে করে তার হার্টের অবস্থা বুঝতেও দেরি হয়েছিল।
তবে এই মৃত্যুকে তিনি দুর্ভাগ্য হিসেবে বিবেচনা করে বলেন, ‘আমি এই হাসপাতালেই অনেক অ্যানেস্থেসিয়া দিয়েছি কোনও সমস্যা হয়নি, কে জানতো ওই দিন দুর্ঘটনা ঘটবে!’
১৫ বছর ওটি স্টাফ হিসেবে কাজ করে সদর হাসপাতাল থেকে আরএমপি কোর্স করা আল নূর হাসপাতালের পরিচালক মো. আবদুল কাদের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কুমিল্লা শহরে কত অপারেশন করতে দেখেছি আমি। আমি জোর গলায় বলতে পারবো হাসপাতালের এমবিবিএস ডাক্তাররাও অনেক সময় ওটি বয়দের কাছে হার মানে। ওটি বয়রা যা পারে অনেক ডাক্তারও তা পারে না।’ এ সময় তিনি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মান নিন্মমানের উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘একসময় এত যন্ত্রপাতি ছিল? তখন অপারেশন হয়নি? এই দুইটা যন্ত্রই এক। এগুলো ছাড়া আমার হাসপাতালে আরও অপারেশন হইছে। কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। ওই দিন বাচ্চাটার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হওয়ায় মারা গেছে। এইটা দুর্ঘটনা।’
ওই অস্ত্রোপচারের পরদিন হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে তা সিলগালা করে দেয় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। পরে ৭ সেপ্টেম্বর হাসপাতালও সিলগালা করে দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর শিশুর মৃত্যুর পরদিন ঘটনার তদন্তে গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের কমিটি।
এসব তথ্য নিশ্চিত করে কুমিল্লার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ নাজমুল আলম বলেন, ‘এ ঘটনায় সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে এই বিষয়ে কোনও বক্তব্য দেওয়া যাবে না।’
তবে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের আরেকটি সূত্র বলছে, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একজন মেডিক্যাল অফিসার, কুমিল্লা জেলা সদর হাসপাতালের একজন সার্জন ও একজন অ্যানেস্থেসিয়ার চিকিৎসককে নিয়ে তিন সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি তদন্তের গোপনীয়তার জন্য সিভিল সার্জন ছাড়া কাউকে জানানো হয়নি।









