চট্টগ্রামে ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততা, কমেছে উৎপাদন

নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম
০৪ মার্চ ২০২৫, ১৭:৩১আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৫, ২০:১০

শুষ্ক মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানিতে বেড়েছে লবণাক্ততা। কোনও কোনও সময় এর পরিমাণ সহনীয় পর্যায়ের চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে। এমনকি লবণাক্ততার চাপে জোয়ারের সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে ওয়াসার পানি সরবরাহকারী প্রকল্পও। নগরীর জন্য ওয়াসার পানি আসে হালদা ও কর্ণফুলী নদী থেকে। বর্তমানে হালদার পানিতে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা দেখা যাচ্ছে। অথচ সহনীয় পর্যায় ২৫০ মিলিগ্রাম।

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ওয়াসার পানিতে এ সমস্যা দেখা দেয়। এ সমস্যা এখন দিন দিন বাড়ছে। লবণাক্ততার কারণে ওয়াসার চারটি প্রকল্পে পানির উৎপাদন কমেছে ছয় কোটি লিটার পর্যন্ত। এ কারণে রমজানে পানি সংকটে পড়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রাহকরা। পানি সংকটে থাকা গ্রাহকদের বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য বিভিন্ন মসজিদের টিউবওয়েল থেকে পানির জোগান দিতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড প্রোডাকশন) মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে গেছে। এ কারণে পানি ছাড়া হচ্ছে খুবই কম। এতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি জোয়ারের সময় কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে প্রবেশ করছে। লবণাক্ততার কারণে ওয়াসার চারটি প্রকল্প জোয়ারে সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ কারণে চার প্রকল্পে স্বাভাবিক উৎপাদনের চেয়ে এখন ৫-৬ কোটি লিটার কম পানি উৎপাদন হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থিত ওয়াসার কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-১ এবং প্রকল্প-২ থেকে ১৪ কোটি করে ২৮ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে এ দুটি প্রকল্প থেকে উৎপাদন হচ্ছে ২৬ কোটি লিটার পানি। একইভাবে মদুনাঘাট পানি শোধনাগার প্রকল্প এবং মোহরা পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে স্বাভাবিক সময়ে ৯ কোটি লিটার করে ১৮ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে তা কমে ১৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্রাহকদের মাঝে কিছুটা ভোগান্তিতে ফেলেছে। বর্তমানে হালদার পানিতে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা দেখা যাচ্ছে। অথচ সহনীয় পর্যায় ২৫০ মিলিগ্রাম।

চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টি কম হওয়ায় নদীতে ঢুকছে সাগরের পানি। জোয়ারের পাশাপাশি অমাবস্যা-পূর্ণিমায় এ সমস্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পর্যাপ্ত পানি না ছাড়ায় জোয়ারের সময় লবণাক্ত পানি ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে দৈনিক পানির চাহিদা আছে ৬০ কোটি লিটার। বর্তমানে চারটি পানি শোধনাগার প্রকল্প এবং গভীর নলকূপ থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ কোটি লিটার পানি। সরবরাহ করা পানি থেকে আবার ৩০ শতাংশ পানি ‘হাওয়া’ হচ্ছে। যা ওয়াসার ভাষায় বলা হচ্ছে- সিস্টেম লস। 

বর্তমানে ওয়াসার আবাসিকে গ্রাহক সংযোগ ৭৮ হাজার ৫৪২টি ও বাণিজ্যিক সংযোগ আছে ৭ হাজার ৭৬৭টি। ৭৭০ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে সংস্থাটি পানি সরবরাহ করে। বেশিরভাগ লাইন পুরোনো হওয়ার কারণে এমনিতেই সংকটে থাকতে হয় গ্রাহকদের। লাইনে লিকেজ বা ছিদ্রের  কারণে পানি নষ্ট হচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে এখন সংকট আরও বেশি হচ্ছে।

নগরীর আকবর শাহ এলাকার বাসিন্দা নুরুল আনোয়ার বলেন, ‘এখন নিয়মিত ওয়াসার পানি পাওয়া যাচ্ছে না। দিনে কোন সময় পাওয়া যাবে, তা বুঝতেছি না। সারা বছরই ওয়াসার পানিতে নানা সমস্যা লেগে থাকে। কোন সময় পানিতে ময়লার পাশাপাশি দুর্গন্ধযুক্ত পানিও মিলে। গত কিছুদিন ধরে নতুন সমস্যা লবণাক্ততা।’

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমুদ্রের লবণাক্ত পানি কর্ণফুলী নদীতে ঢুকে পড়ছে। ভাটার সময় পানিতে লবণাক্ততার সমস্যা কম থাকলেও জোয়ারের সময় তা সহনীয় পর্যায়ে থাকছে না। এ কারণে জোয়ারের সময় নদী থেকে পানি তোলা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত পানি ছাড়া হচ্ছে না। সে সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিও হচ্ছে না। কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত পানি ছাড়া হলে এবং বৃষ্টি হলে লবণাক্ত পানি নদীতে প্রবেশ করতো না। নদীতে এখন মিঠা পানির পরিমাণ কমে জোয়ারের সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। এ কারণে লবণাক্ততা সমস্যা হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এ টি এম আবদুজ্জাহের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পাঁচটি ইউনিটে ২৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস পানির স্তর কাপ্তাই লেকে অনেক কমে গেছে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়াতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। মঙ্গলবার ( ৪ মার্চ) রুলকার্ভ অনুযায়ী কাপ্তাই হ্রদে পানির উচ্চতা ছিল ৮৮ এমএসএল (মিনস সি লেভেল)। পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে একটি মাত্র ইউনিট পর্যায়ক্রমে চালু রাখা হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৪০ মেগাওয়াট।’

/এফআর/
সম্পর্কিত
বরিশাল সিটি করপোরেশনঅনলাইন সেবায় মিলবে বিশুদ্ধ পানি, অভিযোগ জানালে সমস্যা সমাধান
সুপেয় পানির সমস্যা নিরসনে ইউনিসেফের সহযোগিতা চাইলেন মির্জা ফখরুল 
মরুকরণের ঝুঁকিতে বরেন্দ্র অঞ্চল, তবু কেউ মানছে না বিধিনিষেধ
সর্বশেষ খবর
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সংশোধন খসড়া অনুমোদন
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সংশোধন খসড়া অনুমোদন
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী