চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর

জ্বালানি সংকটে পণ্য খালাস করতে পারছে না লাইটার জাহাজ

আবুল হাসান, নাসির উদ্দিন রকি 
১৩ মার্চ ২০২৬, ১০:০১ আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৬, ১০:০১

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তেল-গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের বাজারে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে জ্বালানি সংকটের কারণে বড় জাহাজ অর্থাৎ মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করতে পারছে না অধিকাংশ লাইটার জাহাজ। তেলের সংকট স্বাভাবিক না হলে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা। এর প্রভাব পড়তে পারে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ও অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য সরবরাহের কাজে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বন্দরের কাজে অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। আবার রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত বেসরকারি ডিপোতেও এই প্রভাব পড়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন ডিপো পরিচালনাকারীরা। 

মোংলা বন্দরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোংলা বন্দরের বহির্নোঙরে বিদেশ থেকে আসা বড় জাহাজগুলো ড্রাফটের কারণে জেটিতে কিংবা পশুর চ্যানেলে ভিড়তে পারে না। লাইটার জাহাজের মাধ্যমে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে তা জেটি ও দেশের বিভিন্ন নদী বন্দরে পাঠানো হয়। বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন করা প্রায় এক হাজার লাইটার জাহাজের ওপর নির্ভরশীল দেশের পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্ক। 

সম্প্রতি জ্বালানি সংকটে বিপাকে পড়েছে এসব লাইটার জাহাজ। তেল বিপণন কোম্পানিগুলো রেশনিং করার ফলে অনেক জাহাজ প্রয়োজনীয় তেল না পেয়ে অচল হয়ে পড়েছে। লাইটার জাহাজ মালিকের অভিযোগ, ডিপেগুলো আগের মতো ডিজেল না দেওয়ায় তেলের সংকটে অলস বসে আছে জাহাজগুলো। 

মোংলা বন্দরের লাইটার জাহাজের মালিক মো. নুরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বন্দরের ফেয়ারওয়ে এলাকায় অবস্থানরত বিদেশি জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের জন্য আমার লাইটার জাহাজ ভাড়া চাওয়া হয়। ফেয়ারওয়ে এলাকা মোংলা থেকে ১৩১ কিলোমিটার দূরে। সেই নৌপথে যাওয়া এবং আসার জন্য ১৮০০ থেকে দুই হাজার লিটার জ্বালানি (ডিজেল) তেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডিপো থেকে সেই তেল না পাওয়ায় আমা জাহাজ ফেয়ারওয়েতে যেতে পারেনি। এ রকম শতাধিক লাইটার জাহাজ তেল সংকটে পড়ে আছে।’ 

বন্দরের আরেক লাইটার জাহাজের মালিক শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের সংকটে কোনও লাইটার জাহাজ পণ্য নিয়ে কলকাতায় যেতে পারছে না। আমার আরেকটি জাহাজ ফেয়ারওয়েতে অবস্থান করা জাহাজ থেকে সারবোঝাই করে সেখানে অবস্থান করছে। জ্বালানি তেলের সংকটে সেখান থেকে ছেড়ে আসতে পারছে না। এভাবে চললে বন্দরের কাজে অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে।’

একই অবস্থা বন্দরের প্রায় সব লাইটার জাহাজের। তেলের সংকটে বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করতে পারছেন না বন্দরের ব্যবসায়ীরা। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।

মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান টুটুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তেল সংকটে কোনও লাইটার জাহাজ চলাচল করছে না। ফেয়ারওয়েতে থাকা একটি বড় জাহাজ থেকে কয়লা খালাস করতে পারছি না। এতে আমরা ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি। কবে এর সমাধান হবে তাও জানি না।’

তেলের সংকট স্বাভাবিক না হলে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা

মোংলা বন্দরের লাইটার জাহাজের মালিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব হলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত জাহাজ ভাড়া গুনতে হবে। আবার পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে গেলে প্রভাব পড়বে বাজার মূল্যের ওপর। তাই জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ হয়ে গেলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও বাজার সরবরাহ ব্যবস্থায়। দ্রুত জ্বালানি তেলের সংকট সামাল দিতে না পারলে মোংলা বন্দর অচল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

চট্টগ্রামে লাইটার জাহাজ ও ডিপো পরিচালনায় সংকটের শঙ্কা

চট্টগ্রামে ডিজেল সরবরাহ কমানোর প্রভাব পড়েছে আমদানি পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লাইটার জাহাজ চলাচলে। আবার রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত বেসরকারি ডিপোতেও এই প্রভাব পড়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন ডিপো পরিচালনাকারীরা।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য স্থানান্তর করে লাইটার জাহাজে নেওয়া হয়। এরপর নদীপথে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের নানা ঘাটে নিয়ে খালাস করা হয়। এ কাজে ১ হাজার ৫০০ লাইটার জাহাজ রয়েছে। ডিজেল সংকটে নদীপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।

লাইটার জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনাকারী সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) আহ্বায়ক সফিক আহমেদ ৯ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়ে জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক লাইটার জাহাজ কর্ণফুলীতে পণ্য নিয়ে ভাসছে, গন্তব্যে যেতে পারছে না। চিঠিতে বন্দর থেকে নদীপথে পণ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়।

এ ব্যাপারে সফিক আহমেদ বৃহস্পতিবার রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত আছে অন্তত এক হাজার ৫০০ লাইটার জাহাজ। বর্তমানে এসব লাইটার জাহাজে চাহিদা অনুযায়ী তেল মিলছে না। তবে যা পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে টেনেটুনে চলছে। তবে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়নি এখনও।’

বিডব্লিউটিসিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, ‘প্রতিদিন পণ্য পরিবহনের জন্য গড়ে ৭০-৮০টির মতো জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়। একেকটি জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাওয়ার জন্য তিন হাজার লিটার ডিজেল দরকার। তবে অনেকে সরবরাহ না পেয়ে গন্তব্যে যেতে পারছে না।’

একই অবস্থা বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতেও। চট্টগ্রামের ২১টি ডিপোয় রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনা হয়। এরপর কনটেইনারে ভরে বন্দর দিয়ে জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। আবার কনটেইনারে আমদানি পণ্যও বন্দর থেকে এনে ডিপো থেকে খালাস দেওয়া হয়। এসব কাজের জন্য এক হাজার কনটেইনার পরিবহনকারী গাড়ি এবং ২৫০ যন্ত্রপাতি রয়েছে, যেগুলোর জন্য দরকার ডিজেল। তারা ডিপোতে ডিজেল চেয়েও পায়নি।

চট্টগ্রামে ডিজেল সরবরাহ কমানোর প্রভাব পড়েছে আমদানি পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লাইটার জাহাজ চলাচলে

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খলিলুর রহমান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহের কথা জানান। চিঠিতে বলা হয়, ডিপোগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দিনে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন। তবে সম্প্রতি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল লিমিটেড—এই তিনটি কোম্পানি ডিপোগুলোকে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এতে ডিপোগুলো জ্বালানি সংকটে পড়বে।

পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, ‘তেল সরবরাহ চলছে। তবে সরকার বলেছে, ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিতে। এ কারণে কম পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে। একেবারে তেল সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি। ডিজেল নিয়ে কয়েকটি জাহাজ দেশে এসেছে। ফলে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

বন্দরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না বিভিন্ন খাদ্যশস্য ও সারসহ শিল্পের কাঁচামালবাহী বড় জাহাজ। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খোলা পণ্যবাহী বড় জাহাজ কুতুবদিয়া এবং বহির্নোঙর থেকে ছোট জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে। ৫০ হাজার টনের একটি জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে দৈনিক গড়ে তিন থেকে চারটি লাইটার জাহাজ ব্যবহার হয়। সে হিসাবে কুতুবদিয়া এবং বহির্নোঙর মিলে দিনে ১০০ থেকে ১১০টি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে প্রয়োজন হয় প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি লাইটার জাহাজের। বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ তাদের নিজস্ব লাইটার জাহাজ দিয়ে পণ্য খালাস করলেও বাকি আমদানিকারকরা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন থেকে লাইটার জাহাজ বুকিং নেন।

/এএম/ 
সম্পর্কিত
জ্বালানি খাতে আট মাসে ৪১২ কোটি ডলার ভর্তুকি
চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে কবে যাচ্ছে?
সংঘাতের শঙ্কার মধ্যেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিম্নমুখী
সর্বশেষ খবর
২৩০০ আবেদন করে চাকরিহীন প্রিন্সটনের পিএইচডি ধারী
২৩০০ আবেদন করে চাকরিহীন প্রিন্সটনের পিএইচডি ধারী
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির