
আশির দশকে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ৫৪ একর জমির মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়। ওই সময় এটি ছিল এশিয়ার বৃহত্তম হ্যাচারি। কিন্তু দুই দশক পার না হতেই অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে বৃহত্তম এই মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটি। বর্তমানে এ কেন্দ্রের ৮১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৫১টি পদই শূন্য। জনবল সংকট, বিদ্যুৎ সমস্যাসহ নানা সংকটে উৎপাদন মৌসুমে কেন্দ্রে মৎস্য রেণু ও পোনা উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত রেণু ও পোনা উৎপাদনের মৌসুম। তবে জনবল ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মাছ চাষিদের চাহিদার ৩০ ভাগ রেণু ও পোনা প্রজনন কেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তবে একটু নজর দিলেই এ হ্যাচারিই মাছ চাষে ব্যাপক অবদান রাখতে পারতো বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চাঁদপুর সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পাধীন দুই হাজার ৪২৮ হেক্টর আয়তনের বদ্ধ জলাশয়, দুই হাজার হেক্টর আয়তনের নদী, বোরপীট খাল ও প্রধান খালগুলোয় রুই জাতীয় মাছের রেণু ও পোনা সরবরাহ করে মাছের উৎপাদন বাড়াতে ৫৪ একর জমির ওপর ১৯৭৯ সালে মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কাজ শুরু হয়। ৮১ সালের দিকে এর কার্যক্রম শুরু হয়। এখানকার রেণু ও পোনা মানসম্পন্ন হওয়ায় সারা দেশে অল্প সময়ে এটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। ফলে এখানে উৎপাদিত নকার রেণু ও পোনার বিপুল চাহিদা দেখা দেয়। কিন্তু এক দশক পার না হতেই এ কেন্দ্রে নানা সংকট দেখা দেয়।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ৮১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে আছে মাত্র ৩০ জন। তাদের মধ্যে দু’জন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ছয় জন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা থাকার কথা। কিন্তু কমর্রত আছে মাত্র দুজন। এছাড়া রেণু-পোনা উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত মৎস্য সম্প্রসারণ সুপারভাইজার ছয়টি পদের মধ্যে তিনটি, ফিসারম্যান ৮টির মধ্যে চারটি ও হ্যাচারি গার্ড ৮টির মধ্যে চারটি পদ শূন্য রয়েছে। যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই চলতি বছরে অবসর চলে যাবেন। কর্মকর্তাদের জন্য সাতটি আবাসিক ভবন রয়েছে। লোকবল না থাকায় চার তলার একটি ও এক তলার তিনটি ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
মৎস্য ও প্রজনন কেন্দ্র অফিস থেকে জানা গেছে, সংস্কার না হওয়ায় কেন্দ্রের মোট ৬৯টি পুকুরের মধ্যে ৩০টি পুকুর কয়েক বছর ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। পুকুরের পাড়গুলো ভেঙে গেছে। অনেক পুকুর খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। লো-ভোল্টেজের কারণে দুটি গভীর নলকূপ দিয়ে প্রয়োজনীয় পানি ওঠানো যাচ্ছে না। আর মাছ রাখার পুকুরে পানির অভাবে এ বছর প্রতিটি সাত থেকে আট কেজি ওজনের দুই শতাধিক ডিমওলা মাছ (ব্রুড ফিস) মারা যায়।
পাশের খালের দূষিত পানি এনে পুকুর ও হ্যাচারি ভবনে ব্যবহার করতে হয়। এ কারণে অনেক সময় উৎপাদিত রেণুর মান ঠিক রাখা যায় না। প্রজনন কেন্দ্রে বছরে মাছ চাষিদের মৎস্য রেণুর চাহিদা অনুযায়ী রেণু উৎপাদন না হওয়ায় মৎস্যচাষিরা রেণু পাচ্ছে না। প্রজনন কেন্দ্রে কৃত্রিম উপায়ে কাতল, রুই, মৃগেল, কালিবাউস, গ্রাসকার্ফ, সিলভার কার্প, বিগহের্ড কার্প, থাই সরপুটি, কমন কার্প, মিরল কার্প ও গিফ্ট তেলাপিয়া মাছের রেণু ও পোনা উৎপাদিত হয়।
রায়পুর পৌরসভার মেয়র ইসমাইল খোকন বলেন, ‘বেসরকারি হ্যাচারিগুলোর পোনার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। এজন্য সবাই ঝুঁকছে সরকারি হ্যাচারির দিকে। আশির দশকে সরব ছিল এ হ্যাচারি বিনোদনের জন্য পর্যটকরা ঘুরতে আসতো। কর্তৃপক্ষ যদি একটু নজর দেয়, বিশেষ করে জনবল সংকট দূর করে। তবে এ হ্যাচারির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।’
রায়পুর মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘শুরুতে এশিয়ার বৃহত্তম ছিল এ হ্যাচারি। নানা সমস্যায় এখন এটি জর্জরিত। বিরাজমান সংকটগুলো না থাকলে এ বছর এক হাজার কেজি রেণু উৎপাদন করা যেত। প্রজনন কেন্দ্রের সমস্যগুলো লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
/এসটি/








