চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের গোয়াছিবাগান এলাকায় নির্মিত হচ্ছে ১৫০ শয্যার স্বতন্ত্র বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতাল। ২৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ বার্ন ইউনিট’ নামের এই প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী বছর অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে বলে মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৪ সালে প্রকল্পটির প্রস্তাবনা দেওয়া হলেও নানা প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘদিন স্থবির ছিল। ২০১৬ সালে চীনা প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে এলেও অনুমোদন আসে আরও অনেক পরে। ২০২৪ সালের মে মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তা পিছিয়ে কাজ শুরু হয় ওই বছরের ডিসেম্বরে।
প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০১৬ সালে বার্ন ইউনিট করার আগ্রহ প্রকাশ করে চীন সরকার। তার আলোকে চীনের প্রতিনিধিদল ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চমেক হাসপাতাল এলাকায় সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেন। পরের কয়েক বছর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা কয়েক দফা বৈঠক করলেও স্থান নির্বাচনে নির্মাণের কাজ আটকে ছিল। ২০২২ সালে চীন সরকার চমেক হাসপাতাল সংলগ্ন গোয়াছিবাগান এলাকায় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট তৈরির স্থান নির্বাচন করে হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের জানায়।
এটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮৪ কোটি ৭৬ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ টাকা। এর মধ্যে চীন সরকার অনুদান হিসেবে দিচ্ছে ১৮০ কোটি। বাকি ১০৫ কোটি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
২০২৪ সালের ৯ মে একনেক সভায় এ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আগে ২০২৩ সালের মার্চে চীন সরকারের সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তি হয়। যেহেতু চীন সরকার প্রকল্পে ৬৩ শতাংশ অনুদান দিচ্ছে, তাই তাদের নির্বাচিত ঠিকাদারই অবকাঠামোগত নির্মাণ করছে। নির্মাণের যন্ত্রপাতি, প্রকৌশলী ও উপকরণ সরবরাহ করছে দেশটি। প্রকল্প শেষে এক বছর প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে তারা। অন্যদিকে পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ সংযোগসহ বিভিন্ন পরিসেবা দেবে বাংলাদেশ।
বার্ন ইউনিট পরিচালনার জন্য এক হাজার ৬৫ জন জনবল প্রয়োজন হবে। ২০২৪ সালের মে মাসে জনবলের প্রস্তাবনা পাঠানো হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। এতে এক হাজার ৬৫ পদ সৃজনের প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৫০ শয্যার বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে। আগামী বছরের অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।’
তসলিম উদ্দিন বলেন, ‘নির্মাণাধীন এই হাসপাতালে থাকবে শিশুদের জন্য পাঁচটিসহ ২০টি বার্ন আইসিইউ বেড, ২৫টি এইচডিইউ বেড এবং তিনটি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার। রোগী আসা-যাওয়ার সুবিধার জন্য থাকবে তিনটি রাস্তা। ছয়তলা বিশিষ্ট ইউনিটের প্রথমতলায় থাকবে জরুরি ওয়ার্ড এবং ওপিডি, দোতলায় তিনটি অপারেশন থিয়েটার, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), চারতলায় হাইডিপেন্সি ইউনিট (এইচইউ), চারতলায় ও পাঁচতলায় থাকবে সাধারণ ওয়ার্ড এবং ছয়তলায় ওয়ার্ডের সঙ্গে থাকবে কার্যালয়।’
এদিকে, চট্টগ্রামে দগ্ধ রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আগুন, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণসহ নানা কারণে বাড়ছে দগ্ধ রোগী। তবে চমেক হাসপাতালের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে ২৬ শয্যার বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট রয়েছে। বর্তমানে সেখানে গড়ে ৭০ থেকে ৭৫ জন রোগী ভর্তি থাকে। শয্যার পাশাপাশি মেঝেতেও রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে ওয়ার্ডে নেই আইসিইউ শয্যাসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম। যে কারণে বেশি দগ্ধ রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করতে হচ্ছে।
চমেক হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, এ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের ২৬ শয্যা রয়েছে। সেখানে গড়ে ৭০ থেকে ৭৫ জন করে রোগী ভর্তি থাকে। প্রতিদিন অন্তত ১৫ জন দগ্ধ রোগী হাসপাতালে আসে। এর মধ্যে ৮-১০ জনকে ভর্তি দেওয়া হলেও বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। দগ্ধদের জন্য আইসিইউ সেবা বেশি প্রয়োজন। অথচ এখানে আইসিইউ নেই। এ ছাড়া দগ্ধদের জন্য আরও যেসব সেবা প্রয়োজন, তার অনেক কিছুই এখানে নেই। যে কারণে বেশি দগ্ধ রোগীদের ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। তবে নির্মাণাধীন ১৫০ শয্যার বার্ন হাসপাতাল হয়ে গেলে ঢাকায় রোগী পাঠাতে হবে না। চট্টগ্রাম থেকেই দগ্ধ রোগীরা উন্নত চিকিৎসা পাবে।
প্রকল্প পরিচালক ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের নির্মাণকাজ চলমান আছে। ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এটি চালু হলে দগ্ধ রোগীদের উন্নত চিকিৎসা মিলবে।’









