চট্টগ্রামের রাউজানে দিনদুপুরে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে (৪৫) প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ছয় দিনেও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। হত্যায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ভিডিও ফুটেজ দেখে পাঁচ অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তবে অভিযান চালালেও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
গত শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যা করা হয়। তিনি পার্শ্ববর্তী রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদে ছিলেন। তার বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান। পরিবারের সদস্যরা জানান, পরবর্তী নির্বাচনে মাসুদুল ইউপি চেয়ারম্যান পদে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে নিহতের বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী বাদী হয়ে রাউজান থানায় মামলা করেন। মামলার আসামিদের মধ্যে সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হান, তার সহযোগী মোহাম্মদ ইলিয়াস, মোহাম্মদ মোবারক, দিদারুল আলম, মেহাম্মদ ইউসুফসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাত আরও আট জনকে আসামি করা হয়।
পুলিশ জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান বাহিনীর সদস্যরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্ত করা গেছে। এর মধ্যে তিন জনের হাতে ছিল পিস্তল, দুজনের কাছে শটগান।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হত্যায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগই বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত এবং চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এলাকার ত্রাস রায়হান বাহিনীর সদস্যরা মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যায় জড়িত। রায়হান রাউজানের এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরীর অনুগত হিসেবে এলাকায় পরিচিত। রায়হানের অনুসারীরাও এখন বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে বিএনপির নেতারা দাবি করেছেন, অস্ত্রধারীরা বিএনপির কেউ নয়। তাদের কোনও দল নেই।
সিসিটিভির ফুটেজে প্রকাশ্যে দেখা গেলো অস্ত্রধারীদের
গুলি করার সময় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের ত্রাস হিসেবে পরিচিত বড় সাজ্জাদ বাহিনীর অনুগত রায়হান বাহিনীর সদস্যরা মাসুদুল হক হত্যার মিশনে অংশ নেয়। এর মধ্যে পাঁচ অস্ত্রধারীকে চিহ্নিত করা গেছে। তারা হলেন- রাউজানের কদলপুরের মোহাম্মদ ইলিয়াস ওরফে দামা ইলিয়াস, দিদারুল আলম ওরফে দিদার, রাউজান পৌরসভার ফরেস্ট অফিস এলাকার মোহাম্মদ ইউসুফ, রাউজান সদর ইউনিয়নের পূর্ব রাউজান এলাকার মোহাম্মদ জাহেদ ও মোহাম্মদ আবছার। এর মধ্যে ইলিয়াস ও দিদারুল প্রথমে মাসুদুল হককে গুলি ছোড়ে। পরে ইউসুফ, জাহেদ ও আবছার দৌড়ে গিয়ে তাকে লক্ষ্য করে আরও কয়েকটি গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলটি রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মাত্র কয়েকশ’ গজ দূরে। হত্যায় অংশ নেওয়া পাঁচ জনের মধ্যে একজনের মুখে কালো মুখোশ থাকলেও বাকিদের চেহারা স্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে।
সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, মাসুদুল হক দৌঁড়াচ্ছেন। পেছনে অস্ত্রধারীরা। হঠাৎ পাহাড়তলীর চৌমুহনী বাজারের একটি দোকানের সামনে রাখা মোটরসাইকেলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। এ সময় পেছনে থাকা অস্ত্রধারীরা তাকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি করতে থাকে। প্রথম ধফায় গুলি করে ফিরে যাওয়ার পর ৪০ থেকে ৫০ সেকেন্ড পর গাড়িতে না উঠে পুনরায় এসে গুলি করে। এরপর সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে তারা চলে যায়। প্রকাশ্যে বাজারে দিনদুপুরে এ ঘটনা ঘটলেও কেউ এগিয়ে আসেনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী এলাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে চৌমুহনী বাজারে আসেন মাসুদুল। পাঁচ থেকে সাত জন অস্ত্রধারী নিয়ে আরেকটি অটোরিকশা তাকে অনুসরণ করেই বাজারে আসে। মাসুদুল অটোরিকশা থেকে নেমে বাজারের একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়ান। এরপর অপর অটোরিকশা থেকে নেমে সন্ত্রাসীরা মাসুদুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলিতে মাসুদুলের মাথার মগজ বেরিয়ে যায়।
সবাই চিহ্নিত সন্ত্রাসী
পুলিশ জানায়, মামলার আসামি রায়হান চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী। তার বিরুদ্ধে নগর ও জেলায় খুনসহ নানা অভিযোগে ২৪টি মামলা রয়েছে। পুলিশের ধারণা, কর্ণফুলী নদীর বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে মাসুদুলকে হত্যা করা হয়। ইলিয়াসের বিরুদ্ধে পাঁচটি হত্যাসহ ১৮টি মামলা রয়েছে। ইউসুফের বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ চারটি মামলা রয়েছে রাউজান থানায়। দিদার, জাহেদ ও আবছারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একধিক মামলা থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
অস্ত্রধারীরা বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত
হত্যায় অংশ নেওয়া সবাই বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে স্থানীয় লোকজন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইলিয়াস, ইউসুফ, জাহেদ ও আবছার এলাকায় এসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাদের বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও দেখছেন স্থানীয় লোকজন।
অস্ত্রধারীরা বিএনপির কেউ নয় বলছেন নেতারা
তবে হামলায় অংশ নেওয়া অস্ত্রধারীরা বিএনপির কেউ নয় বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি সাবের সুলতান কাজল। একই কথা বলেছেন উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাসান মোহাম্মদ জসিম। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কোনও দলনেতা নেই। তারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপকর্ম করে। তবে রাজনীতিবিদেরও বুঝতে হবে, দাগি সন্ত্রাসীদের বুঝেশুনে কাছে টানতে হবে। আমি সন্ত্রাসীদের পক্ষে নই। এসব খুনিকে ঘৃণা করি। যুবদল নেতা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাউজানের এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরী বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কোনও দল নেই। রাউজানে যারা চাঁদাবাজি করে, মানুষ খুন করে তাদের পুলিশ ধরছে না কেন? অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে গ্রেফতার করতে তো কোনও সমস্যা থাকার কথা নয়। আমি চাই অপরাধীদের গ্রেফতার করা হোক।’
হত্যায় অংশ নেওয়া সবাই রায়হানের অনুসারী
হত্যায় অংশ নেওয়া সব অস্ত্রধারী শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বলছে একই কথা। রাউজানের ৭ নম্বর রাউজান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জুরুরকুল খলিফা বাড়ির মৃত বদিউল আলমের ছেলে মো. রায়হান। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। চট্টগ্রাম পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী। তার বিরুদ্ধে খুন, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে নগরী ও জেলার বিভিন্ন থানায় ১২টি হত্যাসহ ২৪টি মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় জোড়া খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৬টি মামলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে যোগ দিতেন রায়হান। স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যের সঙ্গে তার সখ্যতা ছিল। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিএনপির সভা-সমাবেশে যোগ দিতে শুরু করেন। তার সঙ্গে চট্টগ্রাম বিএনপির একাধিক নেতার যোগাযোগ আছে।
যা বলছেন মাসুদুল হকের স্বজনরা
নিহতের বড় ভাই বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের পরিবার ও আমার ভাইয়ের কোনও শত্রু নেই। যারা তাকে এভাবে হত্যা করেছে, তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করে বের করবে। তবে সিসিটিভির ফুটেজে যাদের দেখা গেছে তাদের দ্রুত গ্রেফতার করলেই খুনের কারণ বেরিয়ে আসবে। ফুটেজে সব হত্যাকারীকে পরিষ্কার দেখা গেছে।’
বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ
হত্যার পেছনে কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন ও সংশ্লিষ্ট আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ বিষয়ে এলাকায় আলোচনা চলছে। স্থানীয় লোকজন জানান, রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী বাজার সংলগ্ন চম্পাতলী ঘাট এলাকায় একটি বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতেন মাসুদুল হক। একইসঙ্গে রাঙ্গুনিয়ার সীমান্তবর্তী রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলার ঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীপাড়ের একটি বালুমহালও নিয়ন্ত্রণ করতেন।
যা বলছে পুলিশ
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাসুদুল হক হত্যায় অংশ নেওয়া পাঁচ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তারা রাউজানের বাসিন্দা। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।’
এ ব্যাপারে জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন. ‘হত্যায় অংশ নেওয়া আসামিরা কদলপুরের পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করেছে। তারা শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত বলে জেনেছি। হত্যাকারীদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান আছে।’









