চট্টগ্রামে দুই কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে দিনদুপুরে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও ৩৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা এক্সেস রোড এলাকায় ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। হামলার সময় অফিসটির আসবাবপত্র, কম্পিউটার ভাঙচুরের পাশাপাশি নগদ ৩৫ লাখ টাকা লুট করা হয়।
হামলার শিকার প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিল বিন মামুন বলেন, ‘চাঁদা না দেওয়ায় সন্ত্রাসীরা আমার প্রতিষ্ঠানে অতর্কিতভাবে হামলা করেছে। দুই দিন আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ফোন করে ডেভিড ইমন (মোবারক হোসেন ইমন) পরিচয়ে আমার কাছে ফোন আসে। এ সময় ইমন বলেছেন, “ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা দেবেন। মাসে দেবেন ১০ লাখ। এখন থেকে ব্যবসা আমরা করবো।” ওই চাঁদা না দেওয়ায় তারা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। ইমন বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী বলে আমাকে জানিয়েছে পুলিশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজ আমাদের প্রতিষ্ঠানে বেতন দেওয়ার দিন ছিল। এজন্য অফিসে ৩৫ লাখ টাকা রাখা ছিল। হামলাকারীরা ওই টাকা নিয়ে চলে গেছে। ৩০-৪০ জন সশস্ত্র মুখোশধারী অফিসে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। তারা মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র নষ্ট করার পাশাপাশি কর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চলে যায়।’
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৭ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের একটি কলরেকর্ড ছড়িয়ে পড়েছে। দুই দিন আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ফোন করে ডেভিড ইমন (মোবারক হোসেন ইমন) পরিচয়ে আদিল বিন মামুনের কাছে যে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল, এটি সেই কথোপকথনের কলরেকর্ড। এতে ফোনের অপর পাশ থেকে ইমনকে বলতে শোনা যায়, ‘এককালীন ২ কোটি টাকা দেবেন। আর প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে দেবেন। না হলে এখন থেকে আমার ছেলেরা ব্যবসা করবে। আপনি আমার ডিটেইলস পুলিশ কমিশনার থেকে জিজ্ঞেস করেন। আপনি আমাকে না চিনলে পুলিশ কমিশনারকে আমার নম্বরটা দেখাইয়েন। ব্যবসা এখন থেকে আমরা করবো। আপনারা করিয়েন না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে স্মার্ট গ্রুপের মুজিবের ঘরে কী হয়েছিল ওটা দেখেছেন তো। মুজিব থেকে গিয়ে আমার কথা জিজ্ঞেস করেন। তাহলে বুঝবেন।’
কলরেকর্ডে ইমনকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘সবাই আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবসা করতেছে। অক্সিজেন বলেন, হাটহাজারী বলেন, বায়েজীদ বলেন, মুরাদপুর বলেন, দুই নম্বর গেট বলেন; সবাই আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবসা করতেছে। দুই দিনের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য গোছায় ফেলবেন।’
কলরেকর্ডের শেষ দিকে ইমন আরও বলেন, ‘ব্যবসা যদি করতে চান, তাহলে ২ কোটি টাকা রেডি রাখবেন। আর প্রতি মাসে ১০ লাখ করে দেবেন। তাহলে চট্টগ্রাম শহরে ব্যবসা করতে পারবেন, না হলে পারবেন না। আপনার বায়োডাটা সবকিছু আমার জানা আছে। দুই দিন পরে দেখবেন কী হয়।’
আজ দিনদুপুরে ওই প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০-৩০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। অস্ত্রধারীরা অফিসের কম্পিউটার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইল এবং বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। একজন কুড়াল দিয়ে কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জামে আঘাত করেন। এ সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখান তারা।
এ ঘটনার পর থেকে ওই এলাকার ইন্টারনেট ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ডিডিএনের পরিচালক রিদোয়ানুল কবির বলেন, ‘হঠাৎ অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। এ সময় কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।’
আজ যে প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে, তার পাশেই চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশের পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। অভিযোগ ছিল, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা এ হামলা চালান। এর আগে গত ২ জানুয়ারিও একই বাসায় গুলি করা হয়। তখন বাসার জানালার কাচ ও দরজায় গুলি লাগে। ওই ঘটনার পর থেকে বাসাটি পুলিশি পাহারায় ছিল। এরপরও আবার গুলির ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
দুপুরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাবিবুর রহমান এবং চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন।
এ হামলার সঙ্গে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা জড়িত বলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে। হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন আছে।’
পুলিশ জানিয়েছে, মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া খুন ও ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ মোট সাতটি মামলার আসামি। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর থেকে বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামের অপরাধজগতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডেভিড ইমন।

দিনদুপুরে সশস্ত্র হামলা, ব্যবসা করতে হলে এককালীন চাঁদা দিবি ২ কোটি, মাসে ১০ লাখ







