‘বেঁচে দেশে ফিরবো কখনও ভাবিনি। এখন মনে হচ্ছে দ্বিতীয় জীবন পেয়েছি’। দীর্ঘ ১১৫ দিন ইরানের হরমুজ প্রণালিতে অবরুদ্ধ থাকার পর দেশে ফিরে এমন অনুভূতি জানিয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রার’ সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. আইয়ুবুর রহমান।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান থেকে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকাল ৫টা ৪২ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনিসহ ১৭ বাংলাদেশি নাবিক। বাকি ১৪ নাবিক আরও কিছু দিন পর মালয়েশিয়া হয়ে দেশে ফিরবেন। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
দেশে ফিরে আইয়ুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। কখন কী ঘটে যাবে, সেই আতঙ্ক নিয়েই দিন কাটাতে হয়েছে। জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন কিনা, তা নিয়েও ছিল শঙ্কা। অবশেষে নিরাপদে দেশে ফিরতে পেরেছি, যেন নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতারের মেসাইয়িদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায় বাংলার জয়যাত্রা জাহাজ। আমরা জাহাজেই ছিলাম। এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের তীব্রতা বেড়েছে। পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি গোলাবারুদের প্রচণ্ড শব্দ। রাত ১২টা ৪০ মিনিটে আমাদের জাহাজের মাত্র ১০০ মিটার দূরে অপর একটি জাহাজে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। জাহাজটিতে ধাও ধাও করে আগুন জ্বলতে থাকে। আগুন নেভাতে সময় লাগে দুই দিন। এই হামলার ঘটনার পর পুরো জেবেল আলী বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। অনেকটাই মানুষশূন্য হয়ে পড়ে বন্দর এলাকা। জাহাজে ছিলাম আমরা ৩১ নাবিক। পরবর্তীতে বিএসসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যদি রিস্ক থাকে তাহলে হোটেলে গিয়ে অবস্থান করার জন্য। আমরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ জয়যাত্রাকে ফেলে যায়নি। জীবনের মায়া ত্যাগ করে জাহাজের মধ্যেই অবস্থান করেছি।’
কখন কী ঘটে যাবে, সেই আতঙ্ক নিয়েই প্রতিদিন কেটেছে আমাদের উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘গোলাবারুদের শব্দে আমরা প্রতিটি দিন আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছি। গোলাবারুদের শব্দ শুনলে উঁকি দিয়ে দেখেছি। মনে হয়, এই বুঝি এসে পড়েছে বোমা। গোলাবারুদের শব্দে কত রাত নির্ঘুম থেকেছি, তা মনেও নেই। এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত ছিলাম আমরা।’
আইয়ুবুর রহমান জয়পুরহাট জেলা সদরের মো. ইউসুফ আলীর ছেলে। তার তিন বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজে কর্মরত আছেন।
দীর্ঘ চার মাসের অনিশ্চয়তা শেষে প্রথম দফায় ১৭ নাবিকের দেশে ফেরা তাদের পরিবার এবং সহকর্মীদের জন্য স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে। এখন অপেক্ষা, অবশিষ্ট ১৪ নাবিকও নিরাপদে দেশে ফিরবেন এবং বাংলার জয়যাত্রা আবারও স্বাভাবিকভাবে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাংলাদেশের পতাকা বহন করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সোমবার (২০ জুলাই) রাতে তারা দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান থেকে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে রওনা হন। দুবাই হয়ে মঙ্গলবার বিকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এরপর তারা স্বজনদের সঙ্গে নিজ নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।’
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির আশপাশে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বাংলার জয়যাত্রা প্রায় ১১৫ দিন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে ছিল। জাহাজটি ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতারের মেসাইয়িদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। যুদ্ধের কারণে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জাহাজসহ নাবিকরা আটকা পড়েন। বাংলাদেশের পতাকাবাহী এই বাল্ক ক্যারিয়ারটি দুই দফা চেষ্টার পর গত ২৩ জুন হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে যায়। সেখানে জ্বালানি নেওয়া ও জাহাজের তলদেশ পরিষ্কারের কাজ শেষে এটি দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরে পৌঁছে।
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে বিএসসির বহরে যুক্ত হয় বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি বাংলার জয়যাত্রা। ৩৯ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজটি নির্মাণ করে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি)। চীন সরকারের সঙ্গে যৌথ অর্থায়নে জাহাজটি কেনা হয়েছিল।








