ইলিশ গেলো কোথায়, ফিরবে কবে?

চাঁদপুর প্রতিনিধি
৩১ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৭আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৭

ইলিশের ভরা মৌসুম শুরু হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং দূষণের কারণে নদ-নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মিলছে না। আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে দেশের প্রধান নদীগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ার কথা থাকলেও বর্তমানে জেলেদের জালে খুব কম মাছই ধরা পড়ছে। 

মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীর মোহনাগুলোতে পলি জমে অসংখ্য ডুবোচর তৈরি হয়েছে। এর ফলে সমুদ্র থেকে ইলিশের নদীতে প্রবেশের প্রাকৃতিক পথ বা পরিযায়নের রুট বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেইসঙ্গে নদীতে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদীর পানির লবণাক্ততা ও স্রোতের গতি পরিবর্তিত হয়েছে। আবার ইলিশ মূলত ডিম ছাড়ার জন্য সমুদ্র থেকে নদীতে আসে, কিন্তু অনুকূল পরিবেশ না পেয়ে তারা গভীর সমুদ্রেই থেকে যাচ্ছে। এজন্য ধরা পড়ছে না। এ ছাড়া নদীগুলোতে অপরিকল্পিত বর্জ্য এবং দূষণ বৃদ্ধির কারণে ইলিশের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে নির্বিচারে জাটকা বা পোনা ইলিশ এবং মা ইলিশ ধরে ফেলার কারণে বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের মতে, আবহাওয়া অনুকূলে আসলে এবং সামনের দিনগুলোতে বৃষ্টিপাত বাড়লে নদীর পানির প্রবাহ স্বাভাবিক হবে। তখন সমুদ্রের ইলিশ আবারও ঝাঁক বেঁধে নদীতে ফিরে আসবে এবং জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

কেউ কেউ বলছেন, ভরা মৌসুমেও নদীগুলোর নাব্যতা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণের কারণে পদ্মা ও মেঘনা নদী থেকে ইলিশ মূলত বঙ্গোপসাগরের গভীর তলদেশে এবং বিকল্প পরিযায়ী রুটে হারিয়ে গেছে। পরিবেশগত নানা পরিবর্তনের কারণে মা ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য সাগর থেকে মিঠা পানির নদীতে আগের মতো আসতে পারছে না। 

আবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করছে। পদ্মা, মেঘনা এবং তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় অসংখ্য ডুবোচর জেগে উঠেছে। উজানের পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর গভীরতা বা নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে সাগর থেকে মিঠা পানির টানে নদীর দিকে আসার স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

জেলেরা বলছেন, নদী ও সাগরে অবাধে প্লাস্টিক, শিল্পবর্জ্য এবং কীটনাশক ফেলার কারণে পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। এই চরম দূষণ ইলিশের প্রধান খাদ্যচক্র ও বাসস্থান ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ ছাড়া উপকূলীয় নদীতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশও মা ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিবেশ নষ্ট করছে। সেইসঙ্গে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কারেন্ট জাল বা ক্ষতিকর ট্রল নেট দিয়ে অবাধে জাটকা এবং মা ইলিশ ধরা হচ্ছে। প্রজনন মৌসুমের আগেই এভাবে মাছ ধরে ফেলার কারণে নদীর ইলিশ কমে গেছে। 

চাঁদপুরের জেলেরা জানিয়েছেন, এখন নদীতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। এতে হতাশ জেলে, আড়তদার ও ক্রেতারা। স্বল্প পরিমাণে মাছ ধরা পড়লেও ইলিশের চাহিদার সঙ্গে বেড়েছে মাছ আহরণের খরচ। তাই আকাশচুম্বী দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে মৌসুম শুরু থেকে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে দাম। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে গড়ে প্রতি কেজি ইলিশের দাম কমেছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে এখনও এক কেজি সাইজের ইলিশের দাম প্রায় তিন হাজার টাকা হওয়ায় অনেকটাই সাধারণ ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে রয়েছে।

চাঁদপুরের পুরান বাজার এলাকার জেলে রহিম ব্যাপারী বলেন, ‘মাছ কম ধরা পড়ায় অনেক জেলে নদীতে কম যাচ্ছেন। এক নৌকায় ছয় জেলে সারারাত নদীতে থেকে মাছ পেয়েছি ১১ হাজার টাকার। এখান থেকে জ্বালানি খরচ, সবার খাবার খরচ, নৌকা মালিকের অংশসহ সব দিয়ে আমরা জনপ্রতি পেয়েছি ৭০০ টাকা।’

একই এলাকার জেলে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘জাটকা রক্ষার সময় প্রচুর মাছ ধরা হয়েছে। এ ছাড়া এখনও নদীতে পানি কম। আর আমি কিছুদিন পর হয়তো আমাদের জালে মাছ ধরা পড়বে।’

চাঁদপুরের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়।

মাছ বিক্রেতা নবীর হোসেন বলেন, ‘এই সময়ে ইলিশ বেচাকেনায় চরম ব্যস্ততা থাকতো। ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে বাজার সরগরম থাকতো। কিন্তু এখন সেই সরগরম নেই, দিন দিন কমছে। ইলিশের তেমন দেখা নেই।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মৌসুম শুরু হওয়ায় ইলিশের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু নদীতে মাছ না পাওয়ায় সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। বিক্রেতাদের কাছে কিছু ইলিশ থাকলেও বেশি দামের কারণে ক্রেতা তুলনামূলক কম।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চাঁদপুর মাছঘাটে গত কয়েকদিন ধরে ঘরে ১০ থেকে ১৫ মণ মাছ আসছে। ইলিশের এই পরিমাণ আমদানি এই বাজারের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। ইলিশ মাছের শূন্যতার কারণে আড়তগুলো খালি পড়ে আছে। মাছের সরবরাহ কম এবং দাম বেশি হওয়ার কারণে বাজারে ক্রেতারাও আসছেন না। ইলিশের সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসবে।’

ইলিশ কম ধরা পড়ছে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টিপাত কি আগের মতো হচ্ছে? বৃষ্টি একেবারেই কম। সেই সঙ্গে নদীদূষণ ও ডুবোচর বেড়ে যাওয়ায় চাঁদপুরে ইলিশ কমে গেছে। তবে নদীতে পানি বাড়লে ইলিশের আমদানি আরও বাড়বে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
চোখের সামনে স্বামী আর ব্যাটা চইলা গেলো, কীভাবে বাঁচবো খোদা?
নৌবাণিজ্য বাড়াতে খাল-নদীপথের টেকসই উন্নয়ন জরুরি: ডিসিসিআই
নদী রক্ষায় একক কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি 
সর্বশেষ খবর
কেমন হলো বুকারের দীর্ঘতালিকা
কেমন হলো বুকারের দীর্ঘতালিকা
তরল নাকি বার সাবান: কোনটি আপনার ত্বক ও স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপযুক্ত
তরল নাকি বার সাবান: কোনটি আপনার ত্বক ও স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপযুক্ত
কম্পিউটার হ্যাং করছে? ক্যাশ ফাইল ডিলিট করার এই সহজ কৌশলটি জানেন তো?
কম্পিউটার হ্যাং করছে? ক্যাশ ফাইল ডিলিট করার এই সহজ কৌশলটি জানেন তো?
প্রতিদিন একটু একটু করে, সারাজীবনে ৫০ টন! জানেন কীসের হিসাব এটি?
প্রতিদিন একটু একটু করে, সারাজীবনে ৫০ টন! জানেন কীসের হিসাব এটি?
সর্বাধিক পঠিত
বৈঠক করে যাওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এসএমএসে সুখবর দিলেন ট্রাম্পের দূত
বৈঠক করে যাওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এসএমএসে সুখবর দিলেন ট্রাম্পের দূত
আবারও অধিনায়ক সাকিব, প্রতিনিধিত্ব করবেন বাংলাদেশকে 
আবারও অধিনায়ক সাকিব, প্রতিনিধিত্ব করবেন বাংলাদেশকে 
এক ডিআইজিসহ পুলিশের ৩ কর্মকর্তা বরখাস্ত
এক ডিআইজিসহ পুলিশের ৩ কর্মকর্তা বরখাস্ত
ডেভিড ইমনের কাছে পাওয়া ভারতীয় আধার কার্ড আসলে কী, কোন কাজে লাগে
ডেভিড ইমনের কাছে পাওয়া ভারতীয় আধার কার্ড আসলে কী, কোন কাজে লাগে
ডেভিড ইমনের কাছে মিলেছে ভারতের আধার কার্ড
ডেভিড ইমনের কাছে মিলেছে ভারতের আধার কার্ড