১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে ডেকে নিয়ে হত্যার পেছনে দুটি ঘটনা কাজ করেছে বলে মনে করছেন মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম। তার সন্দেহ, কিছুদিন আগে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে এক কিশোরের চাকরি নেওয়ার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে। এ ছাড়া সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কয়েকজন কিশোর অপরাধীকে পুলিশে দেওয়ার বিষয়টিও এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার দুই আসামির প্রকৃত বয়স নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অপ্রতিমের মা। এই সন্দেহের বিষয়গুলো এক সহকর্মীকে জানিয়েছেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ নিয়ে অপ্রতিমের মায়ের এই সন্দেহ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির মানববন্ধনে তুলে ধরেন বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার। তিনি বলেন, ‘অপ্রতিমের মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তার অবস্থা খুবই খারাপ। তারপরও তিনি কয়েকটি সন্দেহের কথা এখানে জানাতে বলেছেন। তার পক্ষ হয়ে সেগুলোই বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।’
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে ওই মানববন্ধন ও শোকমিছিল হয়। সেখানে অপ্রতিমের মায়ের বরাত দিয়ে কামরুন নাহার বলেন, ‘অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেফতার বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সালমানপুর এলাকার ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর ঘটনার প্রায় ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছিল। অপ্রতিমের মা মনে করেন, ওই কিশোরের অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ নেওয়ার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনও যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
কামরুন নাহার আরও বলেন, ‘নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কুমিল্লার স্থানীয় কয়েকজন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে পুলিশে দিয়েছিলেন। ওই কিশোর গ্যাং দলের নেতৃত্ব মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) দিতেন বলে অপ্রতিমের মা দাবি করেছেন। ওই ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার কোনও সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের মা।’
গ্রেফতার দুই আসামির প্রকৃত বয়স নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অপ্রতিমের মা। তার বরাত দিয়ে কামরুন নাহার বলেন, ‘মামলায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাদের প্রকৃত বয়স যাচাই করে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। এ জন্য প্রয়োজন হলে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বয়স সংক্রান্ত বিষয়টি নিশ্চিত করার কথাও তিনি বলেছেন। এ ছাড়া অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।’
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ইউট্যাব কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক মো. শাহাদাৎ হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, তারা কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অপ্রতিম হত্যায় যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের পাশাপাশি অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে বলে জানান শাহাদাৎ হোসেন। এর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক শামীমা নাসরিন বলেন, ‘অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড শুধু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নয়; এটি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সংকটেরও প্রতিফলন।’
প্রশাসনকে এ ঘটনায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শামীমা নাসরিন বলেন, ‘অপ্রতিমের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু দেশের আরও অনেক অপ্রতিমের জন্য এভাবে কথা বলার কেউ নেই। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের।’
অপ্রতিম হত্যা মামলার বিচার দ্রুত দেখতে চান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, ‘অপ্রতিম আমাদের সন্তান। আমরা আর কত মানববন্ধন করবো? শুধু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।’
মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার, শিক্ষক সমিতির সদস্যসচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও হলের প্রভোস্টরা উপস্থিত ছিলেন। মানববন্ধনের আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শোকমিছিল করেন শিক্ষকেরা।
গত শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন শনিবার দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
শনিবার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজায় শত শত মানুষ অংশ নেন। পরে গন্ধমতী ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। ছেলেকে শেষবিদায় দেওয়ার সময় বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আর কাউকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়।’








