নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে রাঙামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে সাময়িকভাবে পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। এই ঘোষণার পরপরই সাজেককেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসায় ধস নেমেছে। ফলে হোটেল-রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িত শত শত ব্যবসায়ী ও শ্রমিক চরম অনিশ্চয়তা ও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সামনেই শারদীয় দুর্গাপূজার টানা ছুটি এবং শীতের পর্যটন মৌসুম। পর্যটনের এই ভরা মৌসুমে হঠাৎ সাজেক বন্ধের ঘোষণায় মাথায় হাত পড়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। তারা বলছেন, এতে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।
গত রবিবার রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের ১৩ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে নিরাপদে এলাকা ছেড়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে স্থানীয় কিছু সংগঠনের ডাকা সড়ক অবরোধের কারণে সাজেকগামী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং বহু পর্যটক বিপাকে পড়েন। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশাসন এই কঠোর পদক্ষেপ নিলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, সাজেককে কেন্দ্র করেই এ অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়। এভাবে হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা আসায় হোটেল-রিসোর্ট মালিকদের পাশাপাশি পরিবহন মালিক, জিপ চালক, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং হস্তশিল্প বিক্রেতারাও মারাত্মক সংকটে পড়েছেন।
সাজেক গাড়ির লাইনম্যান মো. ইয়াছিন আরাফাত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সাধারণত শুক্র ও শনিবার বাদে অন্যান্য দিনে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি গাড়ি সাজেকে প্রবেশ করে। গত শনিবার রাতেও ৫৮টি গাড়িতে প্রায় ৫০০ পর্যটক এসেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক বন্ধ ঘোষণায় গাড়ি চালক ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়লেন। ব্যবসার এমন সময়ে কেউ এমন পরিস্থিতি চায় না। এই নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত হলে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হবে আমাদের।
অবকাশ রিসোর্টের ম্যানেজার মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, আগামী ১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সাজেকের অধিকাংশ রিসোর্ট ও কটেজ আগেই বুকিং হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে ১৯ তারিখ থেকে শতভাগ বুকিং ছিল। কিন্তু হঠাৎ বন্ধের সিদ্ধান্তে এখন অগ্রিম বুকিং বাতিল করে টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই এই ক্ষতির ধাক্কা সামলে ওঠা বহু ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব হবে না।
রিসোর্ট মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, সাজেকে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩৫টি রিসোর্ট এবং শতাধিক রেস্তোরাঁ রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন গড়ে ২০০টি পর্যটকবাহী গাড়ি সাজেকে আসা-যাওয়া করে, যার প্রতিটি গাড়ির গড় ভাড়া প্রায় ১৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া যানবাহন খাত থেকেই ১০ দিনে অন্তত ২ কোটি ২৬ লাখ টাকার ব্যবসা হতো- যা এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে সাজেকে ১৩৫ রিসোর্টতে প্রায় ৬৭৫টি কক্ষ বা রুমে প্রতিদিন রুম ভাড়া বাবদ আসে অন্তত ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এতে আগামী ছুটির ১০ দিনে কেবল রুম ভাড়া বাবদই প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হবে। রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য দোকানের ক্ষতি হিসাব করলে এই অঙ্ক অন্তত ১০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।
সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ন দেব বর্মন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী মঙ্গলবার বিকালের মধ্যে সব পর্যটক সাজেক ত্যাগ করবেন। কিন্তু অনির্দিষ্টকালের এই নিষেধাজ্ঞার কারণে সাজেকের পুরো ব্যবসা বাণিজ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সাজেকে ১৩৫টি রিসোর্ট রয়েছে। যাতে ১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত শতভাগ বুকিং ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য আমরা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। এটি যত দীর্ঘ হবে, আমাদের আর্থিক ক্ষতি তত বাড়বে, ক্ষতিগ্রস্ত হবো আমরা সবাই।