কুমিল্লার লাকসামে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে কর্ণফুলী কমিউটার এক্সপ্রেস ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের এক উপসহকারী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলে রেললাইন মেরামতের কাজ চললেও এ বিষয়ে রেলওয়ের কন্ট্রোল রুমকে না জানানোর অভিযোগে তাকে বরখাস্ত করা হয়। একই সঙ্গে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে।
বুধবার রাত ১১টার দিকে এসব তথ্য জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় রেলওয়ের ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁঞা।
বরখাস্ত হওয়া উপসহকারী প্রকৌশলীর নাম সারোয়ার আলম। তিনি রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগের অধীন ফেনী অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন। তার অধীনেই লাকসামের আজগরা বাজারসংলগ্ন নাওটি স্টেশনের আউটার এলাকায় রেললাইন মেরামতের কাজ চলছিল।
বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওই এলাকায় কর্ণফুলী কমিউটার এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিনের তিনটি চাকাসহ পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে অন্তত সাত জন যাত্রী আহত হন। তাদের কেউ গুরুতর আহত হননি। আহত ব্যক্তিরা স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁঞা বলেন, রেললাইন মেরামতের কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী বা উপসহকারী প্রকৌশলী রেলওয়ের কন্ট্রোল রুমকে বিষয়টি জানান। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে রেললাইন মেরামতের কাজ চললেও কন্ট্রোল রুমে সে তথ্য দেওয়া হয়নি। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সারোয়ার আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদকে প্রধান করে চার সদস্যের এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাওটি স্টেশনের আউটার এলাকায় রেললাইন মেরামতের কাজ চললেও বিষয়টি নাঙ্গলকোট ও লাকসাম রেলস্টেশন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি। এমনকি ট্রেনচালক বা লোকোমাস্টারও এ বিষয়ে জানতেন না।
লাকসাম রেলওয়ে জংশনের স্টেশনমাস্টার ওমর ফারুক ভূঁইয়া জানান, রেললাইন মেরামতের বিষয়ে প্রকৌশল বিভাগের কেউ তাদের জানাননি। প্রকৌশল বিভাগ রেললাইনে কাজ করলে আগে ও পরের দুটি স্টেশনকে জানানোর কথা। কিন্তু এ ধরনের কাজের বিষয়ে তারা কোনও তথ্য পাননি।
ট্রেনটির লোকোমাস্টার মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, রেললাইনে মেরামতের কাজ চলার বিষয়ে তাকে জানানো হয়নি। বুধবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে নাঙ্গলকোট স্টেশন থেকে ‘লাইন ক্লিয়ার’ সংকেত পেয়ে লাকসাম স্টেশনের দিকে যাত্রা শুরু করেন। পথে রেললাইন মেরামতের কাজ চললেও নাঙ্গলকোট কিংবা লাকসাম স্টেশন থেকে তাকে সতর্ক করা হয়নি।
দুর্ঘটনার পর থেকে লোকোমাস্টার দাবি করে আসছেন, রেললাইনে কাজ চলার বিষয়টি আগে জানতে পারলে তিনি সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারতেন।
এর আগে রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের ফেনী অঞ্চলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী জয়দেব শীল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দুর্ঘটনার পেছনে ট্রাফিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং—দুই বিভাগেরই দায় থাকতে পারে। লাল পতাকা দেখানোর পরও ট্রেন না থামানো এবং আগের দিন থেকে রেললাইনের কাজ চললেও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বা তথ্য না পাঠানোর বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। বুধবার সন্ধ্যায় উদ্ধারকারী ট্রেন পৌঁছানোর পর লাইনচ্যুত বগি সরানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামতের কাজ শুরু হয়। দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের আপলাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ডাউনলাইন দিয়ে দুই দিকের ট্রেন চলাচল চালু রাখা হয়। এরপর উদ্ধারকারী ট্রেনসহ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেছেন রেলওয়ের কর্মীরা। কাজ শেষ করে আপলাইন দিয়ে আবার ট্রেন চলাচল চালু করার চেষ্টা চলছে।