গাজীপুরের কৃষকেরা এবারও বোরো আবাদে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ধানের বিশেষ রোগ ‘নেক ব্লাস্ট’ এর কারণে তারা এবারও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাবেন না। তাই অনেকে রোপণ খরচ উঠাতে না পারার আশঙ্কায় ধান মাড়াই না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী, চিনাশুখানিয়া, ফাউগান, গাড়ারনসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এরকম তথ্য পাওয়া গেছে।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ফাউগান গ্রামের মো. আমান উল্লাহ এ বছর সাড়ে আট বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ইরি-২৮ ধানের চাষ করেছেন। তিনি জানান, তিন সপ্তাহ আগে জমির ধান পাকতে শুরু করেছে। ধান গাছের শীষের গোড়ার অংশ হলুদ হয়ে গেছে। কিন্তু, হলুদ অংশের ভেতরে ফাঁকা। ধান পাকা রংয়ের কিন্তু ধানে চাল নেই।
আরও পড়তে পারেন : জয়কে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার হবে: প্রধানমন্ত্রী
আমান উল্লাহ আরও বলেন, স্থানীয় কৃষি বিভাগের লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করে ইউরিয়া ও কীটনাশক দিয়েছি। কোনও লাভ হয়নি। দিন দিন জমির সব ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। গত তিন বছর এ জাতের চাষ করেছি, এ রকম ক্ষতি হয়নি। বিঘা প্রতি কমপক্ষে ২০ মণ ধান পেয়েছি। এবার এক মণ ধানও পাবো না। অথচ বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকা।
একই গ্রামের আলফাজ উদ্দিন বলেন, তিনি চার বিঘা জমিতে ইরি -২৮ ধানের জাত আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকা। অন্যান্য বছর প্রতি বিঘায় ২০ মণ ধান পাওয়া যেত। এবার সব ধান পরিপক্ক হওয়ার আগেই পেকে গেছে। কিন্তু ধানের চাল অপরিপক্ক!
শ্রীপুর পৌরসভার কাজীপাড়া আবাসিক এলাকার আলহাজ কাজী গিয়াস উদ্দিন বলেন, এবার ৮৫ শতক জমিতে ইরি-২৮ ধানের আবাদ করেছি। ফলন পেয়েছি মাত্র চার মণ। তার প্রতিবেশী আলাউদ্দিন বলেন, আড়াই বিঘা জমিতে ইরি-২৮ করেছি, পাঁচ মণ পাই কিনা সন্দেহ রয়েছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রধান এবং প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আব্দুল লতিফ স্বাক্ষরিত এক পত্রে জানা গেছে, নেক ব্লাস্ট ধানের একটি ছত্রাকজনিত রোগ। ধানের ফুল আসার পর শীষের গোড়ায় রোগটি দেখা যায়। বোরো মৌসুমে হাইব্রিড জাতের মধ্যে এ রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এটি আবহাওয়ার ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। দিনে গরম রাতে ঠাণ্ডা, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি এবং ঝড়ো হাওয়া এ রোগের কারণ।
আরও পড়তে পাড়েন : সেই বিলাসবহুল রেঞ্জ রোভার গাড়ি আটক
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের গাজীপুর জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মো. জসীম উদ্দিন বলেন, প্রশিক্ষণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে জানানো হয়েছে। কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হলেও তারা যথাসময়ে তা আমলে নেননি। ধানের বাজারমূল্য কম থাকায় কৃষকেরা রোগ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে আগ্রহ হারিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, ধানের থোর অবস্থায় তাপমাত্রা ১৮ সেন্টিমিটারের নিচে নেমে আসলে এ রোগের সৃষ্টি হয়। একটানা কয়েক বছর একই জমিতে একই জাতের ধান আবাদ করলেও এ রোগ দেখা দিতে পারে। এ রোগের জীবাণু বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। ফলে কৃষকদের আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এ রোগে যা করতে হবে তা হলো-ধানের শীষ বের হওয়ার পরই ছত্রাকনাশক ট্রুপার বিঘা প্রতি ৫৪ গ্রাম অথবা নেটিভো বিঘা প্রতি ৩৩ গ্রাম শেষ বিকালে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। এ রোগের প্রথম অবস্থায় জমিতে পানি ধরে রাখতে পারলে এর ব্যাপকতা অনেকাংশে কমে যাবে।
আরও পড়তে পারেন : পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলায় সাক্ষ্য দিতে হবে না বিশ্বব্যাংককে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মাসুদ রেজা সাংবাদিকদের বলেন, কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মীদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। নেক ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে কৃষকদের মধ্যে সতর্কবার্তা পৌঁছানো হয়েছে। আমরা ধানের এ রোগ মোকাবেলা করতে পারব। শ্রীপুরে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে ইরি-২৮ আবাদ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, গাজীপুর জেলায় ৫৯ হাজার ২৮৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫ হেক্টর জমির ধান নেক ব্লাস্টে আক্রান্ত। আবাদকৃত জমির মধ্যে ইরি-২৮ ছাড়াও ইরি-৫৮ এবং চায়না হীরা ধান রয়েছে।
/এআর/টিএন/ আপ-জেবি








