দায়িত্ব বুঝে পাওয়ার কথা ১৩ জুলাই, কিন্তু তর সইলো না গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল হক বাদল সরকারের। অভিযোগ রয়েছে নির্ধারিত সময়ের আগেই জোর করে ইউপি কার্যালয় দখল করে এরই মধ্যে তিনি উঠিয়ে নিয়েছেন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পৌনে এক কোটি টাকা। এ ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে ওই ইউনিয়নে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান শামসুল হক বাদল সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই দায়িত্ব গ্রহণের কথা স্বীকার করে দাবি করেছেন, দায়িত্ব এখনই বুঝে নেওয়ায় কোনও অসুবিধা নেই। আর ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়নের প্রয়োজনেই টাকা তোলা হয়েছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান শামসুল হক বাদল সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের কথা ১৩ জুলাই। তবে গত ১৯ মে শপথ নিয়ে পরদিনই ইউনিয়ন পরিষদ দখলে নেন তিনি। এর পরপরই পরিষদের দুটি ব্যাংক হিসাব থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের প্রায় পৌনে এক কোটি টাকারও বেশি তুলে নেন। তবে স্থানীয় প্রশাসন বলছে, এ ব্যাপারে তারা কিছু জানে না।
পরিষদ দখল ও প্রকল্পের টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়ার বিষয়ে গত ৩ জুন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বরমী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বেপারী। অভিযোগে তিনি বলেন, নতুন চেয়ারম্যান শামসুল হক বাদল সরকার বেআইনিভাবে ইউনিয়ন পরিষদের দখল নিয়েছেন এবং দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন সদস্যদের নিয়ে রেজুলেশন করে পরিষদের দু’টি ব্যাংক হিসাব থেকে পৌনে এক কোটি টাকার বেশি উঠিয়ে নিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী আগামী ১৩ জুলাই তার দায়িত্ব নেওয়ার কথা।
অভিযোগে তিনি আরও বলেন, তুলে নেওয়া টাকার মধ্যে কর্মসৃজন কর্মসূচি প্রকল্পের শ্রমিকদের ১৬ লাখ ৪০ হাজার ২৫০ টাকাও আছে। এসব টাকা শ্রমিকদের একাউন্টে যাওয়ার কথা থাকলেও অগ্রণী ব্যাংক বরমী বাজার শাখার ম্যানেজারের সঙ্গে যোগসাজস করে নতুন চেয়ারম্যান ওই টাকা তুলে নিয়েছেন। এছাড়াও একই শাখা থেকে স্টাফদের বেতন, উন্নয়ন কাজ, আপদ কালিন ব্যয় ও মাস্টার রোলে নিয়োজিত কর্মচারীদের বেতনের ৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকাও তুলে নিয়েছেন। রাস্তা, কালভার্ট, পাইপ ইত্যাদি প্রায় সাড়ে ৪৩ লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন সোনালী ব্যাংক শ্রীপুর শাখা থেকে।
নিয়ম অনুযায়ী উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি ও পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে পুরনো চেয়ারম্যানের নতুন চেয়ারম্যানের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করার কথা। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় দখলের ঘটনার কথা জানে না উপজেলা অফিস।
জানা গেছে, বর্তমান চেয়ারম্যানের অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তদন্ত শুরু করেছে। মন্ত্রীর দফতর থেকে অভিযোগপত্র সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে।
নবম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে শ্রীপুরের আটটি ইউনিয়নে ভোট হয় গত ২৩ এপ্রিল। গত ১৯ মে বরমী, গাজীপুর, গোসিংগা, কাওরাইদ, মাওনা, প্রহাদপুর, রাজাবাড়ী ও তেলিহাটি ইউনিয়নের নতুন চেয়ারম্যানরা শপথ নেন। অন্য সব চেয়ারম্যান বর্তমান চেয়ারম্যানদের মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তবে ব্যতিক্রম বরমী ইউনিয়নের নতুন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচত চেয়ারম্যান বাদল। তিনি শপথ নিয়েই অফিস দখল করে নিয়েছেন।
গত ২৬ মে বরমী ইউনিয়ন পরিষদের সচিব এনামুল হক মোল্লা নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগের চিঠিতে তিনি বলেন, অভিযোগ দাখিলের দিন ও তার আগের দিন নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান শামসুল হক বাদল সরকারের নির্দেশে কিছু লোক তাকে সব দাফতরিক কাজ বন্ধ করার জন্য হুমকি দিয়েছেন। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তিনি ইউএনওকে অনুরোধ করেন।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বনানী বিশ্বাস জানান, গত ১৯ মে নবনির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানদের শপথ হয়েছে। বর্তমান চেয়ারম্যানদের মেয়াদ শেষ হলে তারা দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এ সংক্রান্ত চিঠিও নতুন চেয়ারম্যানদের দেওয়া হয়েছে। বরমী ইউনিয়নের নতুন চেয়ারম্যানের জোর করে পরিষদ দখলের কথা তিনি জানতেন না। তিনি বলেন, বর্তমান চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার আইনি সুযোগ নেই। এমন হয়ে থাকলে সেটি বেআইনি কাজ হয়েছে।
বরমী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বেপারী বলেন, ২০১১ সালের ১৩ জুলাই চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ নেন তিনি। আগামী ১৩ জুলাই তার মেয়াদ শেষ হবে। এর আগেই নতুন চেয়ারম্যান তাকে হুমকি দিয়ে পরিষদ দখল করে নিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করার পাশাপাশি তিনি থানায়ও অভিযোগ করেছেন। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানা-পুলিশের কাছে সহায়তা চেয়েছেন। বর্তমান চেয়ারম্যান আরও অভিযোগ করেন, নতুন চেয়ারম্যান তাকে পরিষদে যেতে বাধা দিচ্ছেন। অথচ তিনি এখনও বরমী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।
সোনালী ব্যাংকের গাজীপুর অঞ্চলের সহকারী উপ-মহাব্যবস্থাপক সহিদুল ইসলাম সরকার বলেন, হিসাবধারী পরিবর্তন করতে হলে পুরাতন চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর অথবা উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তার কাউন্টার স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক। এসব নিয়ম লঙ্ঘন হয়ে থাকলে এবং অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব নিতে হবে বর্তমান চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেই। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মেয়াদ পাঁচ বছর। নির্বাচিত হওয়ার পর পরিষদের প্রথম সভার দিন থেকে মেয়াদ হিসাব করা হয়। নবনির্বাচিতদের নির্বাচনের এক মাসের মধ্যে শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু শপথ নিলেই দায়িত্ব নেওয়া যাবে তা নয়। বর্তমান চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বাদল সরকার বলেন, ইউএনও অফিসে শপথের দিনই তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই তিনি মিলাদ পড়িয়ে পরিষদের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বর্তমান চেয়ারম্যানের কাছ থেকে নয়, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ আইন তার জানা আছে। সে মতে শপথ নেওয়ার পরই তিনি বৈধ চেয়ারম্যান। তাই দায়িত্ব নিতে কোনও অসুবিধা নেই। ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা তোলার বিষয়ে তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়নের প্রয়োজনেই টাকা তোলা হয়েছে।
/এফএস/টিএন/








