মাদারীপুরের চরমুগরিয়া বন্দরে খাবারের অভাবে অসহায় হয়ে পড়েছে দেড় হাজারের বেশি বানর। বনবিভাগ বানরগুলোর জন্য নয়াচর এলাকায় ‘ইকোপার্ক’ নামে একটি অভয়াশ্রম তৈরি করেছে। কিন্তু বানরগুলোকে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে এই এলাকায় যে কেন্দ্রগুলোতে বানরগুলোকে খাবার দেওয়া হতো এখন সেখানে খাবার দেওয়া হয় না। তাই খাদ্য সংকটে পড়ে বানরগুলো কখনও আশেপাশের বাসা-বাড়িতে হামলা চালায়, কখনও খাবার পেলে বড়দের অত্যাচারে ছোট বানরগুলো ভাগ না পেয়ে মরাকান্না জুড়ে দেয়।
এ পরিস্থিতিতে বিষয়টির দিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মাদারীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক মিয়াজউদ্দিন খান। বিষয়টি নিয়ে ভাববেন বলে জানিয়েছেন নৌমন্ত্রী।চরমুগরিয়া বন্দরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী খান (৬০) বলেন, বানরগুলো বাড়ি-ঘরে হামলা চালায়। খাবার লুটপাট করে, ঘর ভাংচুর করে। বানরের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। কোথাও কোনও খাবার পেলে বানরগুলো হামলে পড়ে। বড় বানরগুলো ছোট বানরগুলোকে তাড়িয়ে দেয়। ফলে ছোট বানরগুলো খাবারের জন্য যে কান্নাকাটি করে তা দেখে আমাদেরও খারাপ লাগে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ইমরান সাগর বলেন, বানরগুলো এই চরমুগরিয়া বন্দরের ঐতিহ্য। তারা এখনও বন্দর ছেড়ে যায়নি। জন্মের পর তাদের পরিচিত স্থান এই বন্দরের গাছ-গাছালি ও আলো-বাতাসের প্রতি টান থাকায় তারা যুগ যুগ ধরে এখানে বংশ পরম্পরায় অবস্থান করছে। তবে তাদের খাদ্যের অভাব স্থানীয় জনগণকেও ভোগায়। খাবার না থাকলে তারা স্থানীয় বসতবাড়িতে হামলা করে। তা না হলে তারা শান্তিপূর্ণভাবেই মানুষের মাঝে অবস্থান করে।
সরেজমিন স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মাদারীপুর জেলা সদর থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে চরমুগরিয়া অবস্থিত। এক সময় এখানে জনবসতি ছিল কম, তখন থেকে হাজারখানেক বানর এখানে মুক্ত পরিবেশে বেঁচে ছিল। তবে ক্রমবর্ধমান মানুষের চাপে পরিবেশটা এখন অনিবার্যভাবে বানরদের প্রতিকূলে চলে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, ষাটের দশকে মাদারীপুরের কুলপদ্বী ও চরমুগরিয়া বন্দরে প্রায় ১০ হাজার বানরের বসবাস ছিল। গভীর বন-জঙ্গল ও শত শত ফলজ গাছ থাকার কারণে বিভিন্ন এলাকা থেকে বানর এখানে এসে আশ্রয় নিত। অনেকের মতে, ওই সময় নদিয়া-শান্তিপুর অঞ্চল থেকে হাজার হাজার বানর দল বেঁধে এ অঞ্চলে আসতো। বানরের পাশাপাশি বেশ কিছু হনুমানও এসেছিল, যেগুলো পরে মস্তফাপুর পর্বতের বাগানে আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে, মানুষের আবাসস্থল সংকটের কারণে বন উজাড় হয়ে যাওয়ায় কমে গেছে ফলদ বৃক্ষ। এ কারণে চরম খাদ্যাভাবে পড়েছে এসব বানর। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যায় এখানকার বানরকুল বিপন্ন হয়ে পড়ে। তখন বেশ কিছু বানর মারা যায়।
সরেজমিন দেখা গেছে, বানরগুলো বন্দরের ৮টির বেশি জায়গায় দলবদ্ধভাবে বাস করে। তবে ৩টি স্থানেই বানরের বিচরণ বেশি। এ স্থানগুলো হল জেটিসি’র পরিত্যক্ত ভবন বর্তমানে কমিউনিটি সেন্টার এলাকা, আদমজী পাট কেন্দ্র ও চৌরাস্তার স্বর্ণকার পট্টি। বানরদের মধ্যে আবার ৩ থেকে ৪টি দল রয়েছে। একদলের বানর অন্যদের এলাকায় গেলে শুরু হয় সংঘর্ষ।
স্থানীয়রা জানান, ৬ মাস পর পর বানরগুলো বাচ্চা দেয়। কিন্তু সে বানরগুলো কোথায় যাচ্ছে কেউ জানে না। ক্ষুধার জ্বালায় ইতোমধ্যে অনেক বানর মাদারীপুর শহরে ও অন্যান্য জায়গায় চলে গেছে। শহরেও দেখা যায়, টিফিন বা খাদ্য হাতে কোনও ছাত্র-ছাত্রী বা ব্যক্তি সুষ্ঠুভাবে বাড়ি ফিরতে পারেন না। রেস্টুরেন্ট ও হোটেল ব্যবসায়ীরা এবং ফল বিক্রেতারা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত থাকে। বানরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে বন্দরের অনেক বাড়ি-ঘরের দরজা জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ এদের ঠেকাতে চাইলে বানরগুলো দলবেঁধে তার ওপরে হামলা চালায়।
সম্প্রতি মাদারীপুর সার্কিট হাউসের একটি সভায় মাদারীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক মিয়াজউদ্দিন খান চরমুগরিয়ার বানরদের খাবার দেওয়ার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আগে জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ থেকে বানরদের খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। এখন বিষয়টি বন্ধ রয়েছে। বানরগুলোকে খাবার ব্যাপারে নৌ-মন্ত্রী কোনও ব্যবস্থা নিলে ভালো হয়।
এ প্রসঙ্গে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী ও মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শাজাহান খান বলেন, বানরগুলোর জন্য ইকোপার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। তবুও বানরগুলো এখন চরমুগরিয়ায় আছে। তাদের খাবার বা স্থানান্তরের বিষয়ে ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
/জেবি/টিএন/
আরও পড়তে পারেন : ফেনীতে ৩ হাসপাতালকে জরিমানা








