মানিকগঞ্জ জেলায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে আসা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানান অজুহাতে সরকার নির্ধারিত ফি’র চেয়ে তিন গুণ টাকা আদায় করছে সরকারি ও বেসরকারি কলেজ। উপজেলা সদরের কলেজগুলোয় সরকারি ভাবে নেওয়ার নিয়ম এক হাজার সেখানে খোদ সরকারি কলেজেই নেওয়া হচ্ছে তিন হাজারের বেশি টাকা। এছাড়া বেসরকারি কলেজগুলোতেও একই দৃশ্য।
জেলার সাতটি উপজেলার চারটি সরকারি কলেজসহ ২৩টি কলেজে ভর্তি হতে আসা বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। গত এক সপ্তাহের অনুসন্ধানের জানা গেছে, কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীর ভর্তির বিপরীতে প্রায় কয়েক কোটি টাকার ভর্তি বাণিজ্য হয়েছে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌসের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি এই প্রথম জানলেন। এ অভিযোগ যদি সত্য হয় তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মানিকগঞ্জের শিবালয় সদর উদ্দিন ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষা র্বোডের নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত আড়াই হাজার টাকা করে আদায় করার অভিযোগ উঠেছে।
কলেজের অধ্যক্ষ ড. বাসুদেব দে শিকদার এই প্রতিবেদককে জানান, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়ার প্রয়োজন সাড়ে চার হাজার টাকা। এলাকার ছাত্রছাত্রীরা দরিদ্র বলে এক হাজার টাকা কম করে নিয়ে সাড়ে তিন হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে কিছু লিখতে চাইলে লিখতে পারেন, কিছু আসে যায় না। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে শুধু চলতি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ায় এক হাজার ২৬০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সরকারি নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত মোট ৩১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম গালিব খান জানালেন, সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে কোনওও টাকা নিয়ে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বাড়তি টাকা শিক্ষার্থীদের ফেরত দেওয়া হবে।
উপজেলা পর্যায়ে সরকারি কলেজে সবচেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে ঘিওর সরকারি ডিগ্রি কলেজে। সেখানে শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারি নিয়মের অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ টাকা করে। কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসার মো. সাজাহানের দাবি, সরকারি নিয়ম মেনেই তিনি টাকা নিচ্ছেন। এক হিসেবে দেখা গেছে এ পর্যন্ত ওই কলেজে সাড়ে পাঁচ শত শিক্ষার্থীর ভর্তি সম্পন্ন হয়েছে। তাতে ১৩ লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত টাকা আদায় হয়েছে। কোটা পূরণ হলে টাকার পরিমাণ ২০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।
সাটুরিয়ার সরকারি ভিকু মেমোরিয়াল কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে আসা শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জনপ্রতি ১৯৩৫ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে। এ ‘মডেম চার্জ’ ও ‘পরিবেশ উন্নয়ন চার্জ’ নামে খাত সৃষ্টি করে চার্জ ধরা হয়েছে শিক্ষার্থীপ্রতি ২ শ’ টাকা। এই কলেজে একাদশ শ্রেণির কোটা ৭৫০টি। এ হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সরকারি নিয়মের বাইরে সাড়ে ১৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে কলেজ অধ্যক্ষ আবুল হোসেন সিকদার জানালেন, কলেজ উন্নয়নের স্বার্থে এই টাকা নেওয়া হয়েছে। ‘মডেম চার্জ’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কম্পিউটার, প্রিন্টিংচার্জ ও ইন্টারনেট খরচ মেটাতে এই খাত করা হয়েছে।
মানবিক বিভাগে ভর্তি হতে আসা বাদশা মিয়া নামের এক শিক্ষার্থী জানান, প্রথমে ২০০ টাকা দিয়ে রশিদ কেটে ফরম সংগ্রহ করেছি। পরে নির্ধারিত ২৭৩৫ টাকা কলেজে জমা দিয়েছি।
এছাড়া জেলা সদরের অবস্থিত সরকারি দেবেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে গড়ে ৭ থেকে ৮ শ’ টাকা ও সরকারি মহিলা কলেজে শিক্ষার্থীপ্রতি বেশি নেওয়া হচ্ছে ৪৩৫ টাকা।
এদিকে জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে দৌলতপুর উপজেলার মতিলাল ডিগ্রি কলেজে নেওয়া হচ্ছে এক হাজারের স্থলে সর্বচ্চ ১৮শ’ পর্যন্ত টাকা। কলেজের অধ্যক্ষ মো. আনোয়ার হোসেন জানালেন, এবার তারা প্রায় ৫৭৩ জন জন শিক্ষার্থীর কোটা পেয়েছেন।
ঘরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা খাজা রহমত আলী কলেজের অধ্যক্ষ মো.আব্দুর রউফ জানালেন, তার কলেজে ৮৫০ শিক্ষার্থীর ভর্তি কোটা রয়েছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২৩৯৭ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকদের বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে নেওয়া হচ্ছে এই টাকা।
ব্যতিক্রম
এদিকে একই উপজেলার তালুকনগর ডিগ্রি কলেজে সরকার নির্ধারিত ফির চাইতে অর্ধেক কম নেওয়া হচ্ছে। কারণ হিসেবে কলেজের অধ্যক্ষ অজিত সাহা জানান, নদীভাঙনের এলাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবার দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এই কলেজে মাত্র ১৪৫ জন শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হচ্ছে।
চলতি বছরের একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় যা আছে:

দেশের প্রতিটি উপজেলা সদরের কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সর্বসাকুল্যে এক হাজার টাকা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ১২ মে শিক্ষা সচিব মো. সোহরাব হোসাইন স্বাক্ষরিত ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি নীতিমালা ২০১৬ তে স্পষ্ট জানানো হয়েছে এ তথ্য।
আরও উল্লিখিত আছে, শিক্ষার্থীর নিকট থেকে অনুমোদিত সব ফি যথাযথ রশিদ প্রদানের মাধ্যমে নিতে হবে। শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে এই নীতিমালা ভঙ্গ করা হলে বেসরকারি কলেজ ও সমমানের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পাঠদানের অনুমতি বা স্বীকৃতি বাতিলসহ কলেজটির এমপিও বাতিল করা হবে এবং সরকারি কলেজ ও সমমানের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
/এইচকে/আপ-এনএস/
আরও পড়ুন: সোর্স মুছাসহ পলাতক পাঁচ আসামির দেশ ছাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা








