গাজীপুরের শ্রীপুর-মাওনা সড়কটি গত পাঁচ বছর ধরে চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পুরো আট কিলোমিটার সড়ক জুড়েই গর্ত। দু’বার দরপত্র আহ্বান করলেও সংস্কার কাজ শুরু হয়নি। বিকল্প শ্রীপুর-মাস্টার বাড়ি সড়কেরও বেহাল দশা। তাই বাধ্য হয়েই শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন। নিয়মিত চলাচলকারীরা এখন শারিরীকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
শ্রীপুর পৌরসভা, মাওনা, গাজীপুর, তেলিহাটী, রাজাবাড়ী এবং প্রহলাদপুর ইউনিয়সবাসীর এ সড়ক দিয়েই উপজেলা শহরে যাতায়াত করতে হয়। কাওরাইদ, বরমী ও গোসিঙ্গা ইউনিয়নবাসীকে উপজেলার বাইরে জেলা শহর বা রাজধানীতে যাতায়াত করতে হলে এ সড়ক দিয়েই যাতায়াত করতে হয়।
গত ২০ বছর যাবত শ্রীপুর-মাওনা সড়কে অটোরিকশা চালাচ্ছেন কেওয়া গ্রামের আকবর আলী (৪৮)। তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে সড়কটি ভাঙা কম ছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছর যাবত সড়কটির এমন দশা যে গর্তগুলোতে চাকা পড়লে উঠতে চায় না।’
তিনি বলেন, ‘আগে মাসে গাড়ি মেরামত বাবদ খরচ ছিল সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা। এখন ভাঙা সড়কের জন্য গাড়ি মেরামত বাবদ মাসিক খরচ কমপক্ষে ১০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগে প্রতিদিন ১৮’শ থেকে দুই হাজার টাকা উপার্জন হতো। এখন ৭’শ থেকে ৮’শ টাকা উপার্জন হয়। আর যারা ভাড়ায় চালায় তারাতো তিন বেলা খাবারের টাকাটাও উঠাতে পারেন না। যাত্রীরা পেছনে উঠলেও ঝাঁকুনির কারণে সামনে বসতে চায় না।’
অটোরিকশা চালক টেংরা গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, এ সড়কে গাড়ি চালাতে গিয়ে বুকে, পেটে স্থায়ী ব্যাথা হয়ে গেছে। যাত্রীরা দু’একবার যাতায়াত করলেও চালকদের সারাদিন যাতায়াত করতে হয়।
অপর চালক শরাফত উদ্দিন বলেন, ভাঙার প্রতিযোগিতায় শ্রীপুর-মাওনা সড়কটি দেশের মধ্যে প্রথম হবে। আগে শ্রীপুর থেকে মাওনা যেতে সময় লাগত ১৫ মিনিট। এখন কমপক্ষে ৪০ মিনিট লাগে। গাড়ি কাত হয়ে হেলে দুলে নদীর ঢেউয়ের মতো চলতে থাকে। প্রতিদিন ছোট-খাট দুর্ঘটনা ঘটছে।
চালক ফুল মিয়া বলেন, গাড়ি ২/৩দিন চালানোর পর গ্যারেজে ঢুকাতে হয় মেরামতের জন্য। যে সকেট জাম্পার আগে তিন বছর স্থায়ী ছিল এটি এখন এক মাসেই বিকল হয়ে পড়ছে।
রেন্ট এ কার চালক মিলন শেখ বলেন, এ সড়কে রোগী নিয়ে চলতে গেলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। আট বছর আগে থেকে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে উঠতে শুরু করে। তখন শ্রীপুর উপজেলা শহর থেকে বের হতে শ্রীপুর-মাস্টারবাড়ী সড়ক ব্যবহার করতাম। ওই সড়কও গত পাঁচ বছর যাবত একই অবস্থা হয়ে গেছে।
প্রভাতী বনশ্রী পরিবহনের চালক আকবর হোসেন বলেন, এ সড়কে চলাচল করতে সময়, অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে। গাড়ির যন্ত্রপাতি ব্যয় বেড়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে ধীরে চলাচল করতে হচ্ছে। ফলে দ্বিগুণেরও বেশি সময় লাগছে।
শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আর. জে. রিফাত পাশের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর থেকে নিয়মিত যাতায়াত করেন। তিনি বলেন, ‘পুরো রাস্তা যাতায়াত করি, কোনও চিন্তা থাকে না। কিন্তু শ্রীপুর-মাওনা সড়কে উঠলেই শুরু হয় বিড়ম্বনা। এক ফুট পর বড় বড় গর্ত। ভেবে পাই না কি করব আবার কলেজে না যেয়েও পারি না।’
শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মিজানুর রহমান প্রতিদিন গাজীপুর মহানগরের বোর্ডবাজার থেকে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন।
তিনি বলেন, ‘সড়কটির ব্যাপারে গাড়িতে বসে সাধারণ মানুষের মন্তব্য শুনি। মনে হয় সাধারণ মানুষজন সড়কটির জন্য কতই না অসহায়।’
শ্রীপুরের গোসিঙ্গা ইউনিয়নের কর্ণপুর গ্রামের আজিজুল ইসলাম গাজীপুরে একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির শোরুমে চাকরি করেন। তিনি বলেন, ‘এলাকার রাজনীতিবিদরা নিজেদের জন্যই ভাবেন। জনগণের জন্য ভাবলে এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তা পাঁচ বছর যাবত সংস্কারবিহীন অবস্থায় থাকতে পারে না।’
তেলিহাটী গ্রামের আব্দুল হান্নানের ছেলে প্রভাষক সোহরাব হোসেন বলেন, শ্রীপুরে যেতে যতটুকু সম্ভব শ্রীপুর-মাওনা সড়ক ব্যবহার করি না। পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাই।
শিক্ষিকা ইয়াসমিন সুলতানা বলেন, সড়কটি বর্ষায় থাকে কাদায় পরিপূর্ণ আর শুষ্ক মৌসুমে থাকে ধুলোবালিতে আচ্ছন্ন। ভাঙা এ সড়কে নিয়মিত চলাচলে শারীরিক ব্যাথা স্থায়ী হয়ে উঠেছে। এখন ব্যাথার ওষুধ খেতে হয় নিয়মিত।
সড়ক ও জনপথের ঢাকা জোনের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ডেপুটি অ্যাসিন্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) মুজাহিদ জানান, সড়কটি সংস্কারের জন্য সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (এডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার) আব্দুস ছালাম জানান, সড়কটি সংস্কারের জন্য দু’বার দরপত্র আহবান করা হয়েছে। প্রথমবার ঠিকাদাররা অতিরিক্ত লেস দেখিয়ে সিডিউল জমা দিয়েছিলেন। পরে যাচাই বাছাই করে সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। এরপর আবার দরপত্র আহবান করা হয়েছে। ঠিকাদাররা যথারীতি সিডিউল জমাও দিয়েছেন। সড়ক ও সেতু অধিদফতর থেকে যাচাই বাছাই করে সিডিউলগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রথমবার অতিরিক্ত লেস দিয়ে সিডিউল জমা দেওয়ায় দরপত্র বাদ করা হয়েছে। পুনরায় দরপত্র আহবান এবং গত অর্থ বছরের বরাদ্দ থেকে সংস্কার কাজটি হওয়ায় একটু বিলম্ব হয়েছে।
/বিটি/








