কিশোরগঞ্জে যাচাই-বাছাই কমিটির তালিকায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা স্থান পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। বাদ পড়েছেন গেজেটভুক্তরাও। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিরোধের জেরেই এমন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাদপড়া মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য, ২০১৪ সালে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচনে যারা বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন যাচাই-বাছাইয়ে মূলত তাদের বাদ দিয়েছে। এছাড়া মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিতর্কিত ভূমিকায় থাকা অনেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন বলেও তারা অভিযোগ করেছেন।
নতুন তালিকা থেকে বাদ পড়া মধ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিম। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত সহচর হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। সৈয়দ নজরুলের নির্দেশে তিনি বিভিন্ন ক্যাম্পের তথ্য-উপাত্ত, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকার তথ্য দিতেন রাষ্ট্রপতিকে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহের কাজও করেছেন তিনি।
নিভৃতচারী আব্দুল করিমের নাম মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে আগে গেজেটভুক্ত হয়নি। তিনিও এসব নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাননি। তবে এবার তালিকাভুক্ত হতে আবেদন করেছিলেন। তবে যাচাই-বাছাই কমিটি তাকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. আসাদুল্লাহকে সভাপতি ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসউদকে সদস্য সচিব করে গঠিত সাত সদস্যের কমিটি এ যাচাই-বাছাই করেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, সদর উপজেলা কমান্ডার অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান, কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের প্রতিনিধি ভূপাল চন্দ্র নন্দী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি আবু বক্কর ছিদ্দিক, জামুকার প্রতিনিধি মফিজ উদ্দিন ও জেলা কমান্ডের প্রতিনিধি বাশির উদ্দিন ফারুকী।
মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, কমিটির যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ক্রটি ছিল। তারা বহু মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষীদের কথা শোনেননি, কাগজপত্রও ঠিক মতো দেখেননি। যে নিয়মকানুন অনুসরণ করে তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ছিল, তা মানেনি।
এ প্রসঙ্গে কমিটির সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'ভারতে গিয়ে যারা প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, যাচাই-বাছাইয়ে তাদেরকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কমিটির সদস্যদের মতামত গুরুত্ব পেয়েছে বেশি।'
শহরের ৩২ এলাকার বাসিন্দা গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা (ম. ৮২৭৮৬) ডা. সুকেশ চন্দ্র রায়ের অভিযোগ, যাচাই-বাছাই কমিটি তার কোনও কাগজপত্র দেখেনি। তাকে এক মিনিটও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তিনি যেসব কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন সেগুলো জমা দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, 'আমাকে কোনও প্রশ্নই করা হয়নি। তাহলে কোনও তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করা হলো?'
৭৭ বছর বয়সী এই চিকিৎসক জানান, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতের বড়ছড়া ক্যাম্পে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে পানছড়া, মনাই ও বালাট ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা বর্তমান রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সঙ্গে তার দেখা হয়। বলাট ক্যাম্পের জয়বাংলা কার্যালয়ে গেলে এমএনএ আবদুল কুদ্দুস মোক্তার তাকে রণাঙ্গনে পাঠানোর পরিবর্তে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করার দায়িত্ব দেন। সেখানেই ছয়-সাত মাস আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করেন তিনি। তবে যাচাই-বাছাই কমিটির দৃষ্টিতে তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন।
শহরের আরেক গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা শাখাওয়াত হোসেন ও মোহাম্মদ রুকন উদ্দিন বলেন, 'মুক্তিবার্তা সনদ, সাব সেক্টর কমান্ড সনদসহ যা কিছু দরকার সবই উত্থাপন করা হয়েছে কমিটির সামনে। সাক্ষীরাও ছিলেন। কিন্তু তাদের কাছ থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়নি। অন্যায়ভাবে তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দিয়েছে কমিটি।'
সদর উপজেলার দানাপাটুলি ইউনিয়নের গাগলাইল গ্রামের গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা নূরুল হক ভূঁইয়া, সুন্দর আলী, হাজিপুরের ফজলুর রহমান, মাইজখাপন ইউনিয়নের হাজিরগল গ্রামের আবুল হাশেমও তাদের কোনও সাক্ষীকে জেরা না করার অভিযোগ তুলেছেন। অথচ তাদের মতে, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় এ কাজ ছিল বাধ্যতামূলক।
ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধা সুন্দর আলী বলেছেন, ‘তালিকা থেকে বাদ না দিয়ে তারা যদি গুলি কইরা মাইরালতো তা অইলেও অত কষ্ট হইত না আমার!’
নূরুল হক ক্ষুব্ধ স্বরে বলেন, 'আমারে জ্যান্ত কবর দিয়ালছে বাছাই কমিটি!'
এদিকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় বিতর্কিত এক ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে কমিটির বিরুদ্ধে। শহরের আখড়াবাজার এলাকার কাজী সেলিম খানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। ১৯৭১ সালে তার সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও হয়। কিন্তু কমিটি তাকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জে ২৯৩ জনের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ৪৮ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যাচাই-বাছাই কমিটি। ২৮ জানুয়ারি ওই তালিকা প্রকাশ করা হয়।
যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য ভূপাল চন্দ্র নন্দী জানান, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যদি কোনও কারণে বাদ পড়েন তাহলে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। কাজী সেলিম খান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'অবশ্যই তার কোনও ডকুমেন্ট-টকুমেন্ট হয়তো দাঁড়া করাইছে, যার কারণে অইছে। না অইলে তো অইত না।'
ঠিকমতো সাক্ষী না নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এমন হলে তারা জামুকাতে যেতে পারেন। আর কমিটিতে সাতজন লোক। এনো সাতজনের সাত মত। আমি একা রাইট দিলে কী অইব, বাকি ছয়জন যদি রাইট না দেয় তাহলে তো কোনও কাজ হবে না।'
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মতিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, '৪৩ বছর পরে একটা যাচাই-বছাই হচ্ছে, এখানে সমস্যা তো থাকবেই। এতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কেউ বাদ পড়তে পারেন। মুক্তিযোদ্ধা নয় এমন ব্যক্তিরাও তালিকাভুক্ত হতে পারেন। এটা তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, অস্বাভাবিক কিছু না।'
কিছু মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, 'যারা বাদ পড়েছেন তারা আপিল বা রিট করে চলে আসতেও পারেন। আমরা তো লাস্ট অপরচুনিটি না।'
এ প্রসঙ্গে যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. আসাদউল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
/জেএইচ/এসটি/আপ-এমও/







