এফআইআর খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ

বিজয় রায় খোকা, কিশোরগঞ্জ
০৩ এপ্রিল ২০১৭, ০৭:৫৪আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৭, ১৫:৩৩

ওসি মো. আহসান উল্লাহ এফআইআর খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে অপহরণ মামলার এক আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী মডেল থানার ওসি মো. আহসান উল্লাহর বিরুদ্ধে। মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে তিনি এ কাজ করেছেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি তিন মাস গোপন থাকলেও সম্প্রতি ঘটনাটি জানাজানি হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এফআইআর বইয়ের পাতা ছিঁড়ে একই নম্বরে দুটো মামলা পর্যন্ত রুজু করেছেন ওসি।
কটিয়াদী থানা সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২২ জানুয়ারি রাত সোয়া ১২টায় কটিয়াদী মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী/০৩) এর ৭/৩০ ধারায় একটি মামলা রুজু করা হয়। কটিয়াদী থানার বীর নোয়াকান্দি গ্রামের আসাদ মিয়া বাদী হয়ে মামলাটি (নম্বর-১৩) করেন। এফআইআর বইয়ের ক্রমিক নং- ০১৭১৭১৩ এ লিপিবদ্ধ করা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় থানার এসআই মো. মঈন উদ্দীনকে। কিন্তু ওইদিনই এফআইআর বইয়ের ওই পাতাটি ছিঁড়ে রাত পৌনে ৮টায় পরের পাতায় (ক্রমিক নং- ০১৭১৭১৪) একই নম্বরে ( নম্বর- ১৩) আরেকটি মামলা রুজু করা হয়। একই নম্বরের দ্বিতীয় এই মামলাটির বাদী কটিয়াদী থানার ভোগপাড়া এলাকার কুদ্দুছ মিয়ার মেয়ে পারভীন আক্তার। আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায়ও পারভীন আক্তার বাদী হয়ে দায়ের করা মামলাটির নথি থানা থেকে পাঠানো হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানায়, গত ২১ জানুয়ারি বিকাল ৩টায় কটিয়াদী উপজেলার বীর নোয়াকান্দি গ্রামের আসাদ মিয়া তার মেয়েকে (১৪) একই গ্রামের জমির উদ্দিনের ছেলে রবিন মিয়া অপহরণ করেছে বলে থানায় অভিযোগ নিয়ে যান। ওসির কথামতো আসাদ মিয়া বাদী হয়ে কটিয়াদী মডেল থানায় ওইদিনই একটি লিখিত অভিযোগ করেন। এফআইআর খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ
বাদীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওসির নির্দেশে উপ-পরিদর্শক মো. মঈন উদ্দীন সে রাতেই অভিযান চালিয়ে মূল আসামি রবিন মিয়াকে আটক ও মেয়েটিকে উদ্ধার করে থানা হাজতে রাখেন। এরপর রাত সোয়া ১২টায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী/০৩) এর ৭/৩০ ধারায় মামলাটি রেকর্ড করেন ওসি মো. আহসান উল্লাহ।
মামলার পর আসামিপক্ষের লোকজন থানা থেকে মামলার কপি নিয়ে আসামির জামিন করানোর জন্য ২২ জানুয়ারি সকাল থেকে আদালতে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। অন্যদিকে, সকালে মেয়েটিকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন অফিসে পাঠানো হয়।
এফআইআর খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ
জানা গেছে, মেয়েটিকে সিভিল সার্জন অফিসে পাঠানো হলেও ওসি মো. আহসান উল্লাহ আসামিকে আদালতে পাঠাতে দেরি করতে থাকেন। একপর্যায়ে ওসি আসামি রবিনের বাবা জমির উদ্দিনকে ফোনে থানায় ডেকে নিয়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে দর কষাকষি শুরু করেন।

অভিযোগ রয়েছে, তখন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের মধ্যে একটা রফাদফা হয়। ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য মেয়েটিকে সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে পাঠানো হলেও আসামিদের সঙ্গে যোগসাজস করে ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়াই তাকে আবার থানায় ফিরিয়ে আনা হয়। তুলে দেওয়া হয় বাবা আসাদ মিয়ার কাছে। আর আসামি রবিন মিয়াকে আদালতে চালান না দিয়ে রাতের আঁধারে (২২ জানুয়ারি) থানা থেকে ছেড়ে দেন। এরমধ্যে ওসি রুজুকৃত মামলার এফআইআর কপি মূল বই থেকে ছিঁড়ে ফেলেন। এফআইআর খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ
পরবর্তীতে এই ১৩ নং মামলার স্থলে বইয়ের পরের পাতায় আদালত নির্দেশিত একটি অভিযোগ মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়। সেই মামলাটির বাদী ছিলেন পারভীন আক্তার। কিশোরগঞ্জ আদালতে দাখিল করা অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি রেকর্ড করার পর বিধি অনুযায়ী মামলার এফআইআর কপি আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো হয়।
মামলার বাদী মো. আসাদ মিয়া জানান, তার নবম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে একই এলাকার রবিন মিয়া (১৯) উত্ত্যক্ত করতো। ২১ জানুয়ারি বিকাল ৪টার দিকে তার মেয়েকে রবিনের নেতৃত্বে কয়েকজন সহযোগী অপহরণ করে। তিনি বলেন,‘এদিন থানায় এজাহার দেওয়ার পর রাতেই মামলাটি রেকর্ড করা হয়। পরদিন দুপুরে আমার মেয়ের ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য আমাকেসহ কিশোরগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু, সিভিল সার্জন অফিসে পৌঁছানোর আগেই আমাদের সঙ্গে থাকা কনস্টেবলের কাছে একটি ফোন আসে। তখন আমার মেয়ের মেডিক্যাল পরীক্ষা না করিয়েই কিশোরগঞ্জ জেলখানা মোড় এলাকা থেকে মেয়েসহ আমাকে কটিয়াদী থানায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। বিকালের দিকে কটিয়াদী থানায় গিয়ে দেখতে পাই মামলার আসামি রবিনসহ তার আত্মীয়দের। তখন ওসি সাহেব আমার মেয়েকে নিয়ে বাড়ি চলে যেতে বলেন। পরে শুনেছি আসামি রবিনকে রাতে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এরপর থেকে আমি আর কিছুই জানি না।’
এ বিষয়ে কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসান উল্লাহর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি এলাকায় ভালো কাজ করি বলেই একটা গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এ অভিযোগের এক ভাগেরও সত্যতা নেই।’ এফআইআর খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ
ছেঁড়া এফআই আর-এর কপি সাংবাদিকদের হাতে আছে, তাহলে আপনি কিসের ভিত্তিতে অভিযোগ অস্বীকার করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা কোথায় এ কাগজ পেলো, তা আমি বলতে পারব না।’
তিনি বলেন, ‘আমি স্পষ্ট কথা বলি বলেই কিছু সংখ্যক মানুষ আমার বিরুদ্ধে এলাকায় ক্ষিপ্ত। এফআইআর বইয়ের কাগজ সামান্য কাটা-ছেঁড়া থাকতে পারে।’ ওই মামলাটি দায়ের করা হলে, অবশ্যই আদালতে যেত বলে মন্তব্য করেন ওসি।
ওসি আরও বলেন, ‘আমি ছোটখাট অনেক মামলা নিজ উদ্যোগে আপোস করে দিয়েছি, যাতে এলাকার লোকজনের ঝগড়া-বিবাদ কমে যায়। এর বিনিময়ে একটি পয়সাও গ্রহণ করিনি।’
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কোনও অভিযোগ পাইনি। তবে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
/বিএল/টিএন/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
শুরু হচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ড্রেস ও জুতা বিতরণ
শুরু হচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ড্রেস ও জুতা বিতরণ
সেই কুমির ফেরত চান মাজারের খাদেম যুবদল নেতা
সেই কুমির ফেরত চান মাজারের খাদেম যুবদল নেতা
পিতার সৃজনকর্ম নিয়ে আলোচক যখন নুহাশ হুমায়ূন
পিতার সৃজনকর্ম নিয়ে আলোচক যখন নুহাশ হুমায়ূন
রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা: মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাস
ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা: মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাস