কয়েকদির আগেও কিশোরগঞ্জের হাওরজুড়ে দোল খেতো সবুজ ধানের শীষ। কিন্তু উজানের পানির ঢলে সেখানে এখন কেবল পানি আর অসহায় চাষিদের বিষন্ন মুখ। গত কয়েকদিনে কোথাও বাঁধ ভেঙে, কোথাও বাঁধ উপচে তলিয়ে গেছে অন্তত সাতশ কোটি টাকার বোরো ধান। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে আরও অসংখ্য ধান ভরা হাওর। দিনরাত পরিশ্রম করে ঝুঁকিপূর্ণ হাওরগুলো রক্ষার চেষ্টা করছে লোকজন। বছরের একটি মাত্র ফসল হারিয়ে দিশেহারা কৃষকরা। এদিকে, এসব হাওর অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাওর অধ্যুষিত ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও করিমগঞ্জের অন্তত ৪৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে পাহাড়ি ঢলে। তবে কৃষি বিভাগের দাবি, প্রায় ২৩ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে পাঁচ টন ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। আর বর্তমানে মন প্রতি ধানের দাম এক হাজার টাকা। সেই হিসেবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টাকার হিসেবে ক্ষতি হয়েছে ২৯১ কোটি টাকা। যদিও বাস্তব চিত্র ভিন্ন ।
কৃষক ও বিভিন্ন সূত্রের দেওয়া তথ্য মতে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যা টাকার অঙ্কে ৬২৫ কোটি টাকা। এ বছর কিশোরগঞ্জের হাওরে বোরো আবাদ হয়েছে ৮৬ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে। করিমগঞ্জের সুতারপাড়া ইউনিয়নের বেড়াচাপড়া ও চংনোয়াগাঁও হাওরের কৃষকদের বেশিরভাগ জমির ধান তলিয়ে গেছে ডুবি নদীর উপচে পড়া পানিতে। সামান্য যা আছে, সেগুলোই রক্ষার চেষ্টা করছে স্থানীয় লোকজন। অনেককে আবার গবাদি পশুর খাবার হিসেবে পানি থেকে কাঁচা ধানই কেটে নিতে দেখা গেছে।
এদিকে, ধনু নদীর পানির চাপে প্রয়াগ বিলের ফসল রক্ষা বাঁধটিও পড়েছে চরম ঝুঁকিতে। আতঙ্কিত কৃষকরা বাঁধটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিনরাত পালা করে হাওরে কাজ করছে লোকজন। পাশের সুতারপাড়া হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধটি বাঁচাতেও হিমশিম খাচ্ছেন স্থানীয়রা। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়ার কারণে কোনও ভরসা পাচ্ছেন না তারা। এভাবে চলতে থাকলে বোরো ফসল ঘরে তোলার আশা ছেড়ে দিতে হবে তাদের। শুধু এগুলো নয়, বর্তমানে হাওরের সবগুলো বাঁধই রয়েছে ঝুঁকির মুখে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, তিন হাওর উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অষ্টগ্রাম। সাধারণভাবে ধান পাকার পর বৈশাখের মাঝামাঝি কিংবা শেষে হাওর ডুবতে থাকে। কিন্তু এবার ধান পাকার আগেই নদী ও খালের পানি উপচে ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। এতে করে মাঝারি কৃষক, বর্গাচাষিরা প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছি। সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহযোগিতা করা হবে। বিভিন্ন পর্যায় থেকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার যে দাবি করা হচ্ছে তা যৌক্তিক বলে মনে করছেন এ কৃষি কর্মকর্তা।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক বলেন, ‘এ বছর আগাম বন্যায় প্রচুর ফসল পানির নিচে চলে গেছে। আমি কয়েকদিন ধরেই ইটনা,অষ্টগ্রাম ও মিঠামইনে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছি। বর্তমান চিত্র ভয়াবহ। আমিও সরকারের কাছে আক্রান্ত হাওর এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষনার দাবি করছি। যেভাবেই হোক কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে চাই আমরা।’
এ ব্যাপারে আব্দুল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়াম্যান আ. রশিদ ও পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. কাছিদ মিয়া জানান, উপজেলার বিল-মাকসা, ধোবাবিল, বিল বল্লি, গাইযালা বেরি বিল, বড় হাওর, আব্দুল্লাপুরের হাওর, সমারচর কালীপুরের হাওর, চরপ্রতাব, কাওরাইল, ইকরদিয়ার চর এবং মেঘনা, করাতিয়া কলকলিয়া, বৈঠাখালি ইত্যাদি নদী ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় ১০ হাজার কাঁচা-পাকা ধানের জমি তলিয়ে গেছে।
ইটনা উপজেলার বড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ ভুইয়া অবিলম্বে হাওর এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে কৃষদের সহায়তা করা প্রয়োজন।’
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মেঘনা, কালনী, কুশিয়ারা, ধনু, ঘোড়াউত্রা, ধলেশ্বরীসহ ছোটবড় সব নদীতে অস্বাভাবিকভাবে পানি বাড়ছে। এসব নদীর পানিই দু-কূল উপচে ঢুকে যাচ্ছে হাওরগুলোতে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় এমনটি হচ্ছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। স্থায়ী অবকাঠামো দিয়ে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলো নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে নাব্যতা সঙ্কটে ভোগা নদ-নদীগুলো খননের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন হাওরবাসী।
/বিএল/








