কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশের বৃহত্তম ঈদের নামাজের আগে জঙ্গি হামলার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিতে পারেনি পুলিশ। তবে এ ঘটনার তদন্তে অনেক অগ্রগতি রয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোর্শেদ জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত কাজ এখনও শেষ না হওয়ায় অভিযোগপত্র দিতে আরও সময় লাগবে। তবে তদন্তে অনেক অগ্রগতি রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হামলার পেছনে জড়িত অস্ত্র, অর্থ ও মদদদাতাদের চিহ্নিত করতেই এই বিলম্ব হচ্ছে। উক্ত মামলায় আসামি হিসেবে ঘটনাস্থলে আটক জঙ্গি জাহিদুল হক ওরফে তানিম ও আনোয়ার হোসেন এবং সম্প্রতি গ্রেফতার দেখানো জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজিব গান্ধী- এ তিন আসামি বর্তমানে জেলহাজতে আছে। এছাড়া ঘটনার সময় পুলিশের গুলিতে আহত আরেক জঙ্গি শফিউল ইসলাম (ডন) গত বছরের ৪ আগস্ট সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।’
শোলাকিয়ায় সেদিনের আচমকা জঙ্গি হামলার কথা এখনও ভুলতে পারছে না এলাকাবাসী। আজও তাদের কানে ভেসে ওঠে সেদিনের গুলি আর বোমার শব্দ।
হামলার এক বছর পরও বিপর্যস্ত দিন কাটাচ্ছেন জঙ্গিদের গুলিতে নিজ বাড়িতে নিহত হওয়া গৃহবধু ঝর্না রাণী ভৌমিকের পরিবারের সদস্যরা।
ঝর্নার স্বামী গৌরাঙ্গ নাথ ভৌমিক বলেন, ‘শোক এখনও আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ঘটনার পর অনেকেই অনেক ধরনের সহায়তার কথা জানালেও বাস্তবে কিছুই পাইনি। তাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করে আমাদের বর্তমান অবস্থা জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করছি। সেই সঙ্গে আমার স্ত্রীকে হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’
ঝর্না রাণীর বড় ছেলে বাসু দেব ভৌমিক জানান, তার মায়ের মৃত্যুতে পরিবারটি এলোমেলো হয়ে গেছে। বাবা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন, ছোট ভাইটিও মায়ের শোকে লেখাপড়াতে মন বসাতে পারছে না।
শুধু ঝর্না রাণীর পরিবারের সদস্যরা নয়, সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় এলাকাবাসীও এখনও ভুলতে পারে না সেই দুঃসহ স্মৃতি। স্থানীয় বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা নীরেন্দ্র চন্দ্র দাশ ও দলিল লেখক হাবীবুর রহমান জানান, এখনও সেদিনের কথা মনে হলে আঁতকে ওঠেন। বিশেষ করে এখানকার শিশুদের মন থেকে এই ঘটনার স্মৃতি দূর হচ্ছে না কিছুতেই।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোর্শেদ জামান আরও জানান, শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার অন্যতম হোতা জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজিব গান্ধীকে গত ২৯ মে আদালতের অনুমতিক্রমে তিন দিনের রিমান্ডে নেয় কিশোরগঞ্জ পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে সে পুলিশের কাছে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। এ ঘটনায় অস্ত্রদাতা, অর্থদাতা ও হামলার নেপথ্যে আরও কারা ছিল তাদের নাম প্রকাশ করেছে সে। জিজ্ঞাসাবাদে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি ও শোলাকিয়া হামলায় নিজে জড়িত থাকাসহ আরও অনেকের নাম বলেছে রাজিব। শোলাকিয়ার ঘটনার সঙ্গে গুলশানের হলি আর্টিজান, জাপানি নাগরিক ওসি কুনিও, ঢাকার সিজার তাবেলা হত্যাকাণ্ডসহ আরও কয়েকটি জঙ্গি হামলার সম্পৃক্ততা রয়েছে। শোলাকিয়া জামাতের ইমাম ফরিদউদ্দিন মাউসদকে হত্যা করতেই মূলত হামলা চালায় জঙ্গিরা। এরা সবাই নব্য জেএমবির সদস্য। হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার পরিকল্পনা একসঙ্গেই করা হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, রাজীব গান্ধীর জবানবন্দি অনুযায়ী মামলার অন্যান্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলেই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, গত বছর ৭ জুলাই শোলাকিয়ায় দেশের বৃহত্তম ঈদুল ফিতরের জামাতের সময় নিকটবর্তী চর শোলাকিয়া সবুজবাগ মোড়ে মুফতি মোহাম্মদ আলী জামে মসজিদের সামনে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আচমকা হামলা চালায় একদল জঙ্গি। জঙ্গিদের হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হয় দুই পুলিশ সদস্য ও এক গৃহবধূ। এছাড়া গুরুতর আহত হয় আট পুলিশসহ কয়েকজন মানুষ। ঘটনার সময় পুলিশের গুলিতে এক জঙ্গিও নিহত হয়।
হামলার ঘটনার তিনদিন পর ১০ জুলাই শফিউল ইসলাম (ডন) ও জাহিদুল হক তানিমকে আসামি করে কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় মামলা দায়ের করা হয়। সন্ত্রাস বিরোধী আইনে ৬টি ধারায় দায়েরকৃত মামলায় অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। পাকুন্দিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ সামছুদ্দিন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
/এআর/এসটি/








