জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) চলমান সংকট নিরসনে ছাত্র-শিক্ষক কোনও পক্ষই নমনীয় ভূমিকা পালন করছে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চায় শিক্ষার্থীরা ২৭ মে’র ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা প্রার্থনা করুক। তবেই মামলার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখাবে প্রশাসন। আর শিক্ষার্থীরা চায়, আন্দোলনের মাধ্যমেই মামলা প্রত্যাহারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বাধ্য করবে।
সচেতন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, দুই পক্ষের এমন অনড় অবস্থানের কারণে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে। উভয়পক্ষকে নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সোমবার (৩১ জুলাই) প্রশাসনিক ভবন অবরোধের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং আন্দোলনে সমর্থনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্যমঞ্চের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে শিক্ষক সমিতি। এতেও সংকট সমাধানে দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করে শিক্ষক সমিতি। সেখানে অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে আগামী ৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তাব দেন শিক্ষক নেতারা। এ প্রস্তাবে রাজি না হয়ে আন্দোলন অব্যাহত রেখেই আলোচনায় বসতে চান শিক্ষার্থীরা।
বৈঠকে অংশ নেওয়া জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হোসাইন বলেন, ‘আমরা নিঃশর্তভাবে আলোচনায় বসতে চাই। আর কোনও আশ্বাস চাই না। মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে অবরোধ চলবে।’
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সাধারণ সম্পাদক নজির আমিন চৌধুরী জয় বলেন, ‘২৭ মে’র ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা সংবাদ সম্মেলনে এজন্য দুঃখ প্রকাশ করেছি। কিন্তু ওইদিনকার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের ভূমিকা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয় তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। শিক্ষার্থীরা যা করেনি তার জন্য ক্ষমা চাইবে কেন।’
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরিদ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের অবরোধ প্রত্যাহারের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীরা এতে দ্বি-মত পোষণ করেছে। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য শিক্ষক সমিতি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’
সোমবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে প্রশাসনিক ভবন অবরোধ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরে ৪টার দিকে তারা অবরোধ তুলে নেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে তার কার্যালয়ে ঢুকতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক সমিতি শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে আলোচনা করে সমাধানের পথ বের করা হবে বলে তাদের আশ্বাস দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা ভবনের মূল ফটক ছেড়ে দিলে উপাচার্য, দুই উপ-উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, প্রক্টরসহ কয়েকজন শিক্ষক উপাচার্যের কার্যালয়ে আলোচনার জন্য প্রবেশ করেন।
দুপুর আড়াইটার দিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শুরু থেকেই নৈতিক সমর্থন জানিয়ে আসা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্যমঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করে শিক্ষক সমিতি। ঐক্যমঞ্চের পক্ষে অন্যতম মুখপাত্র সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন, নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. শরিফ উদ্দিন, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া, সহযোগী অধ্যাপক রায়হান রাইনসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক এতে অংশ নেন। শিক্ষক সমিতি থেকে কার্যনির্বাহী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফরিদ আহমেদ, সহ-সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ হাফিজুর রহমান, কার্যকরী সদস্য কৌশিক সাহাসহ আরও কয়েকজন শিক্ষক বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান ঐক্যমঞ্চের শিক্ষকদের কাছে তুলে ধরেন। ৩ আগস্টের প্রস্তাবিত আলোচনায় শিক্ষার্থীরা ক্ষমা প্রার্থনা করলে তা বরফ গলাতে পারে বলে ঐক্যমঞ্চকে জানান শিক্ষক নেতারা। ঐক্যমঞ্চের কয়েকজন শিক্ষক এতে ইতিবাচক মনোভাব দেখান।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. শরিফ উদ্দিন বলেন, ‘প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবাই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের অংশ। শিক্ষার্থীরা অপরাধ করে থাকলে মামলা প্রত্যাহার করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে বিচার করা সম্ভব। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেহেতু একটা অভিযোগ এসেছে সেহেতু শিক্ষার্থীদের অনুশোচনাবোধ দোষের কিছু না। কিন্তু প্রশাসনকে এক্ষেত্রে আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেন বলেন, ‘চলমান সংকটের সম্মানজনক সমাধানে শিক্ষক সমিতি মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।’
প্রসঙ্গত, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত ২৭ মে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে পুলিশি হামলার জেরে উপাচার্যের বাসভবনে ভাঙচুর এবং শিক্ষক লাঞ্ছনার অভিযোগে ৫৬ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্যমঞ্চ’ ও ‘প্রতিবাদের নাম জাহাঙ্গীরনগর’এর ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
/বিএল/








