‘এক বছর হয়ে গেছে, আমার স্বামীর দেহের এক টুকরা হাড়ও পাইনি। হাড় পেলে অন্তত কবর দিয়ে ছেলেকে দেখাতে পারতাম এটি তার বাবার কবর। আর নিজেও কিছুটা শান্তি পেতাম।’ কথাগুলো বলছিলেন এক বছর আগে টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডে বিস্ফোরণে নিখোঁজ জহিরুল ইসলামের স্ত্রী নুরুন্নাহার।
২০১৬ সনের ১০ সেপ্টেম্বর শনিবার টঙ্গীতে টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডে বিস্ফোরণ হয়। ওই বিস্ফোরণে কারখানার ৪১ জন নিহত ও ৩৩ জন আহত হন।তবে এখনও নিখোঁজ রয়েছেন পাঁচ জন।
নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন, আজিম উদ্দিন, মাসুম, আনিসুর রহমান, জহিরুল ইসলাম ও জয়নাল আবেদীন। নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
নিখোঁজ জহিরুলের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার উফুলকি গ্রামে। তার স্ত্রী নুরুন্নাহার বলেন,‘আমাদের একমাত্র ছেলে নাহিদ (৯) আমাকে কাঁদতে দেয় না। কিন্তু সে গোপনে ঘরের পেছনে গিয়ে কাঁদে। আমার ছেলে বাবার জন্য কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু সে তা প্রকাশ করতে পারছে না। এটা আমার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।’
নিহত ব্যক্তিদের অনেকের সন্তানই জানে না তাদের বাবা মারা গেছেন। যে কারণে তারা বাবার সঙ্গে কথা বলার জন্য মায়ের কাছে বায়না ধরে।কোনও মা সন্তানকে বাবার কবর দেখিয়ে বলেন,‘ওখানে তোমার বাবা শুয়ে আছেন।’ আবার কেউ সন্তানের বায়নার কোনও উত্তর দিতে না পেরে চুপ করে থাকেন।
নিখোঁজ সোলেমানের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার অনুহা গ্রামে। টাম্পাকো বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন। তার চাচাতো ভাই খায়রুল ইসলাম বলেন,‘পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন সোলেমান। তার পরিবার কারখানা মালিকের পক্ষ থেকে এক লাখ এবং সরকারের পক্ষ থেকে তিন লাখ টাকা সাহায্য পেয়েছে। সোলেমানের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও মা-বাবা সরকারি সীমিত সাহায্য এবং আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতা নিয়ে কোনও রকমে চলছে।’
মাগুরা জেলার ছনপুর গ্রামের নিহত আজিম উদ্দিনের স্ত্রী পারভীন আক্তার বলেন,‘বিস্ফোরণের পর থেকে আমার স্বামী নিখোঁজ। ডিএনএ টেস্ট করা হয়েছে। তারপরও খোঁজ পাইনি।গত এক বছরধরে স্বামীকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’
বিস্ফোরণে নিহতদের একজন ময়মনসিংহের ত্রিশালের কাকচর গ্রামের আরশাদ আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম। তার স্ত্রী মাসুদা খাতুন বলেন,‘আমাদের ১৭ মাসের একটি সন্তান রয়েছে।আমি প্রতি মুহূর্ত তার শূন্যতা অনুভব করি। আর কোনও কর্মক্ষেত্র যেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ না হয়।’
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার টনকী গ্রামের মাসুম নিখোঁজ। তার স্ত্রী রূপালী বেগম বলেন,‘আমার চার বছরের মেয়ে সানিয়া ঈদের আগের দিন বায়না ধরেছে,বাবার সঙ্গে তার কথা আছে। তবে সে কথা আমাকে বলা যাবে না। শুধু বাবাকেই বলবে। তিন দিন ধরে আমাকে শুধু একই কথা বলেছে। ওর বাবা নিখোঁজের তালিকায় রয়েছে। এক বছর হয়ে গেছে তার কোনও খোঁজ পাইনি।’
তিনি আরও বলেন,‘আমার মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি কেউ নেই। আমার জীবনে একমাত্র ভরসাই ছিলেন তিনি। এখন সেও নেই। কারখানার মালিক এক লাখ টাকা সাহায্য দিয়েছিলেন। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার কারণে সরকার ঘোষিত তিন লাখ টাকা সাহায্যও আমি পাইনি। সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে।’
এ ব্যাপারে ঢাকা সিআইডি ডিএনএ ল্যাবের চিকিৎসক আহমেদ ফেরদৌস বলেন,‘ডিএনএ টেস্টের জন্য যারা আবেদন করেছেন তাদের একটা অংশের প্রতিবেদন দিয়েছি। বাকি যে হাড়গুলো রয়েছে সেগুলো পুড়ে গিয়েছে। এর মধ্যে কিছু মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া হাড় দিয়ে টেস্ট করা সম্ভব নয়। টেস্টের জন্য আরও হাড় চাওয়া হয়েছে। নতুন হাড় পেলে টেস্ট করে এক মাসের মধ্যে ফলাফল দেওয়া সম্ভব হবে।’








