১৭ ডিসেম্বর, ১৯৯৮ সাল। সন্ধ্যার কিছু পরেই পেয়ারা বেগমের জীবনে নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার। প্রতিবেশীর ছোড়া এসিডে ঝলসে যায় মুখসহ শরীরের উল্লেখযোগ্য অংশ। পরে এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় তার চিকিৎসা চলে। টানা আট মাস চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে যান তিনি। এরপরই হয়ে ওঠেন এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। দগ্ধদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘স্বনির্ভর মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’। এরপর থেকে এসিড দগ্ধদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি।
এসিড সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার পর নিজের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার ব্যাপারে পেয়ারা বেগম জানান, তার দগ্ধ স্থানে ২২টি অপারেশন করা হয়। বেশি গরম পড়লে এখনও ক্ষত স্থান চুলকায়। এসিড দগ্ধদের জ্বালা-যন্ত্রণা কেমন তা কেবল দগ্ধরাই বুঝতে পারে। আর সে কারণেই এসিড দগ্ধদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার জন্য শতাধিক দগ্ধ নারী-পুরুষকে সংগঠিত করেছেন তিনি। ২০০৯ সালের শুরুতে তারা সংগঠিত হতে শুরু করেন। তখন তাদের সঙ্গে ১২১ জন দগ্ধ নারী-পুরুষ ছিল। সম্ভ্রান্ত পরিবার, কর্মস্থল পরিবর্তন ও বিভিন্ন সামাজিক কারণে অনেকে প্রকাশ্যে সংগঠনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। তবে ৩৫ জন সদস্য প্রকাশ্যে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সংস্থাটির অপর সদস্য কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণগাঁও গ্রামের নিমাইচন্দ্র সুত্রধরের স্ত্রী পঙ্খী রাণী জানান, ২০০৬ সালের ৪ জুন রাতে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হন তিনি। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিবেশী মলিন চন্দ্র সূত্রধর ও সুকোমল সূত্রধর তাকে এসিড নিক্ষেপ করে। হামলায় তার মুখ ও শরীরের ডান দিকসহ উল্লেখযোগ্য অংশ পুড়ে যায়।
পঙ্খী রাণী আরও জানান, হামলাকারীদের ১০ বছরের সাজা হয়েছিলো নিম্ন আদালতে। এরপর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে তারা। তারপর বাড়িতে এসে তাকে দু’দফায় মারধর করে। গত ঈদুল আজহার কয়েকদিন আগেও হামলাকারীরা তাকে মারধর করেছে বলে অভিযোগ করেন পঙ্খী রাণী। সেসময় এসিড দগ্ধ অপর সদস্যদের সাহায্যে থানায় সাধারণ ডায়রিসহ আইনি সহায়তা নিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এ ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ‘স্বনির্ভর মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’র আরেক সদস্য গাজীপুরের টঙ্গী কলেজ গেট এলাকার মনি আক্তার। ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ এসিড হামলার শিকার হন তিনি। মনি জানান, তার বাবার একটি রিকশা চুরি করেছিল প্রতিবেশী স্বপন। চুরির দায়ে স্বপনকে অভিযুক্ত করলে তাকে এসিডে ঝলসে দেয় সে। পরে থানায় মামলা দায়েরের পর আদালত তাকে ৩০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেন। সম্ভবত এখনও সে জেল হাজতে রয়েছে।
মনি আক্তার আরও বলেন, ‘সংস্থার মাধ্যমে দগ্ধ সদস্যদের মধ্যে সেলাই মেশিন, শিক্ষা সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তায় আইনি সহায়তা, স্বাবলম্বী হতে সরকারি অনুদান সহায়তা ও কুটির শিল্প প্রশিক্ষণ প্রভৃতি সহায়তা দেওয়া হয়।’
এ ব্যাপারে কাপাসিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট রেজাউর রহমান লস্কর মিঠু বলেন, ‘নির্যাতিতদের মধ্য থেকে যখন প্রতিবাদীরা সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠে, তখন সেটা এক ধরনের বিপ্লবে পরিণত হয়। আর তাদের মাধ্যমেই নির্যাতিতরা প্রকৃত সেবা পেয়ে থাকেন। কাপাসিয়ার নারী এসিড দগ্ধরা সংঘটিত এবং নিজেরাই নিজেদের সহায়ক।’
কাপাসিয়া উপজেলা মহিলা ও শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার বলেন, ‘এসিড দগ্ধরা কাপাসিয়ার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের গোসাইরগাঁও এলাকায় অস্থায়ী কার্যালয়ে নিয়মিত মাসিক সভা করেন। নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য এসব সভায় নানা ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনা করেন তারা। বিভিন্ন সময় এসব সভা ভিজিট করা হয়।’ এছাড়াও মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের পক্ষ থেকে নারী দগ্ধদের জন্য প্রচলিত সহায়তা ও আইনি পরামর্শ দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুন:







