রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত দৌলতদিয়া পাটুরিয়া নৌ-রুট। এ রুটে প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে ৫ হাজার ছোট বড় যানবাহন ফেরিতে পদ্মা পার হয়। লঞ্চ ও ফেরিতে নদী পার হয়ে পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছান ১০ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটটি গ্রীষ্ম মৌসুমে নাব্য সংকট, বর্ষায় পানির তীব্র স্রোত, বর্ষা শেষে নদীভাঙনে পন্টুনসহ রেম বেজের ক্ষয়ক্ষতি, শীতে ঘন কুয়াশা, ফেরি সংকটসহ নানা অজুহাতে বছরের প্রায় প্রতিদিনই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। ফলে যাত্রীদের প্রশ্ন, আসলে সংকট কি নদীতে? নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতায়?
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় দেড় শতাধিক যাত্রীবাহী বাস ও দুই শতাধিক ট্রাক সিরিয়ালের প্রহর গুনছে। পাশাপাশি দৌলতদিয়া টার্মিনালে কয়েকদিন যাবৎ আটকে আছে শত শত পণ্যবোঝাই ট্রাক।
দৌলতদিয়া ঘাটে এসে ফেরিতে উঠার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। কখনও কখনও অপেক্ষার মাত্রা পৌঁছে যায় দিন পেরিয়ে রাতে।
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটে ফেরি পরিচালনা করে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এ রুটে ১৪টি ফেরি চলাচল করছে বলে দাবি সংস্থাটির। তবে ঘাট প্রান্তে অপেক্ষমাণ চালকদের অভিযোগ, ১০টি ফেরিও সত্যি সত্যি চলাচল করলে ঘাটে যানবাহনের দীর্ঘ সারি জমতো না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে কষ্ট পোহাতে হতো না সাধারণ যাত্রীদের।
সরেজমিনে দৌলতদিয়া ঘাটে দেখা গেছে, ঘাট প্রান্তে ফেরিমুখী যানবাহনগুলো রাস্তার বাম পাশে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকে। এর মধ্যে যাত্রীবাহী বাসগুলো ফেরিতে উঠার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় বিশৃঙ্খল পজিশনে থাকে। এতে তৈরি হয় জটলা। পাশাপাশি ঘাটে দালালের দৌরাত্ম্যে বড় অসহায় হয়ে পড়েন দূরদূরান্ত থেকে আসা চালকরা। দ্রুত ফেরির দেখা পেতে গুনতে হয় নগদ টাকা।
চালকদের অভিযোগ, দাললরা টাকার বিনিময়ে যোগসাজশে সিরিয়ালে পেছনে থাকা গাড়ি রং সাইড দিয়ে নিয়ে যায়। ফেরির সিরিয়াল করে দেয়। যাদের টাকা নেই তারা দিনের পর দিন ঘাটে আটকে থাকে। দালালদের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসূত্র রয়েছে।
দৌলতদিয়া জিরো পয়েন্টে ডান পাশের রাস্তায় ফেরিতে উঠার জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। তবে বাইপাস সড়ক দিয়ে কোনও প্রকার বাধা ছাড়াই কিছু পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস ফেরিতে উঠার জন্য দ্রুতগতিতে প্রবেশ করে। এতে অন্যদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
ঘাটের কয়েকজন দালাল গাড়িপ্রতি ৫০০ থেকে ১২০০ টাকার বিনিময়ে বাইপাস রাস্তা দিয়ে গাড়ি ফেরিতে উঠিয়ে দেয়। বাইপাস দিয়ে পাটুরিয়া থেকে আসা যানবাহনগুলো ফেরি থেকে নেমে দৌলতদিয়া-গোয়ালন্দ সড়কের দিকে আসার কথা থাকলেও দৌলতদিয়া জিরো পয়েন্ট থেকে উল্টোপথে যানবাহন প্রবেশের ফলে বাইপাসে যানজট তৈরি হয়। আশঙ্কা তৈরি হয় দুর্ঘটনার।
যশোর থেকে ঢাকাগামী ট্রাকচালক তৈহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গত চার দিন ধরে দৌলতদিয়া ঘাটে এসে ফেরির সিরিয়ালের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। কবে ফেরিতে উঠতে পারবো তা জানি না। তবে দৌলতদিয়া ঘাটে মানুষ বড় অসহায়। ’
পাঁচ দিন ধরে ঘাটে আটকে আছেন ফরিদপুর থেকে ঢাকাগামী ট্রাকচালক মাজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ভাই পাঁচ দিন আগে দৌলতদিয়া ঘাটে এসে আটকে আছি। এত ভোগান্তি আর সহ্য হয় না। আমাদের টাকা নাই, খোরাকিও ফুরিয়ে গেছে। আমরা ট্রাকচালকরা নিরুপায়’।
পিরোজপুর থেকে ঢাকাগামী চালক মাসুদ বলেন, ‘দৌলতদিয়া ঘাটে প্রভাবশালীদের দাপটে বাসচালকরা অস্থির। ঘাটে দালালদের দৌরাত্ম্য বেশি। টাকা নিয়ে ট্রাক পার করলেও যাত্রীবাহী বাস বসিয়ে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। চালকরা তো বাধ্য হয়ে গাড়ি চালায়। কিন্তু যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে’।
পটুয়াখালী থেকে ঢাকাগামী একটি কভার্ড ভ্যানের হেলপার মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘যারা পুলিশকে টাকা দেয় তারাই মানুষ। আমরা টাকা দিতে পারি না বলে পুলিশ আমাদের মানুষ মনে করে না’।
পিরোজপুর থেকে ঢাকাগামী বিকাশ পরিবহনের যাত্রী আফরোজা বেগম বলেন, ‘সকালে দৌলতদিয়া ঘাটে এসে বাসের সিরিয়ালে আটকে আছি। দুপুর হয়ে গেলেও এখনও বাস ফেরিতে উঠতে পারেনি। কখন যে ঢাকার বাসায় পৌঁছাতে পারবো তা নিয়ে বড় চিন্তা হচ্ছে। অসুস্থ বোধ হচ্ছে। ঘাটে নারী যাত্রীদের জন্য কোনও ব্যবস্থা নেই।’
দৌলতদিয়ায় কর্তব্যরত ট্রাফিক ইন্সেপেক্টর (টিআই) মো. মাহবুবুর রহমান জানান, ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্ব ঘাটে ফেরি পারাপারে আসা যানবাহনগুলো শৃঙ্খলার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা। গাড়ির সিরিয়ালে শৃঙ্খলা বজায় রেখেই ফেরির জন্য গাড়ি ছাড়া হয়। যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে কুরিয়ার সার্ভিস, মাছ বহনকারী ট্রাক, কাঁচামাল, সবজি বহনকারী ট্রাকগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঠানো হয়। বাকি অপচনশীল বোঝাই ট্রাকগুলো সুবিধামতো সময়ে ছাড়া হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে ঘাটে ভিআইপি পারাপার করা হয়।
তিনি আরও জানান, ঘাটে যেসব যানবাহন বিশৃঙ্খলা করে তাদের বিরুদ্ধে মটরযান আইনে মামলা দেওয়া হয়। প্রতি মাসে দেড় হাজারের বেশি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। ঘাটে দালালরা পুলিশের চোখ এড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশ দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কাজ করে যাচ্ছে। কোনও প্রকার লেনদেন হয় না। জেলা ট্রাফিক বিভাগ ঘাটের যানবাহনের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সব সময় দায়িত্ব পালন করছে।
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক মো. খোরশেদ আলম জানান, বর্তমানে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটে ১৪টি ফেরিতে যান চলাচল করছে। এর মধ্যে পাঁচটি রো রো, দুটি কে-টাইপ, একটি মিডিয়ান এবং ছয়টি ইউটিলিটি। ঈদসহ অন্যান্য উৎসবের সময় ফেরির সংখ্যা বাড়ে।
পাটুরিয়া ৩নং ঘাটের সামনাসামনি চ্যানেলটি সরু হওয়ায় ফেরি অতিক্রমে বিঘ্ন ঘটে। ফেরি চলতে বিলম্ব হয়। এতে সময় বেশি লাগে। উন্নত দেশে একটি ফেরির আয়ুষ্কাল ২০ বছরের বেশি নয়। কিন্তু দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে চলাচলকারী বেশিরভাগ ফেরির বয়স ৪০ পার হয়েছে। ফেরিগুলো বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছে। এগুলোর আধুনিকায়নসহ সংস্কার প্রয়োজন।








