গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভের সময় আহত এক আনসার সদস্য মারা গেছেন। তার নাম ভৈরব চন্দ্র সরকার (৩৫)। বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) দুপুরে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তিনি গাইবান্ধা জেলার গোয়ালবাড়ি এলাকার তপন কুমারের ছেলে।
এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডা. অর্নব সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে তাকে আনা হয়। আনসার সদস্যরা তাকে নিয়ে আসেন। ইসিজি পরীক্ষার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তার গলায় দাগ দেখা গেলেও শরীরে তেমন কোনও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বিকাল পাঁচটার দিকে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।’
এনাম মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের আনসার কমান্ডার মোশারফ হোসেন বলেন, ‘গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনায় আনসার সদস্য আহত হলে তাকে সাভারে নিয়ে আসা হয়।’
ডেল্টা স্পিনিং মিলের প্লাটুন কমান্ডার (পিসি) গিয়াস উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘উত্তেজিত শ্রমিকরা এসে এ কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের বের করে নেওয়ার চেষ্টা করলে আনসার সদস্যরা বাধা দেয়। এ সময় শ্রমিকরা আনসার সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে মারধর শুরু করে। তারা কারখানার বিভিন্ন মালামাল ও গাড়ি ভাঙচুর করে। শ্রমিকরা সিকিউরিটি রুম ও অস্ত্রাগারে হামলা চালায়। তাদের হামলায় তিনিসহ আনসার সদস্য ভৈরব চন্দ্র সরকার, সাজু মিয়া, আবুবকর ও রহিজুল ইসলাম আহত হন। অবস্থা বেগতিক দেখে আনসার সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে ১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়লে হামলাকারীরা পিছু হটে। পরে দুপুরে আহত আনসার সদস্য ভৈরব চন্দ্র সরকার ও সাজু মিয়াকে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ভৈরব চন্দ্র সরকারকে মৃত ঘোষণা করেন।’
কাশিমপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আকবর আলী খান ও শিল্প পুলিশের ইন্সপেক্টর সেলিম রেজা বলেন, ‘২৯ অক্টোবর ১৫ পিস টিশার্ট চুরির ঘটনায় কারখানার কয়েক কর্মকর্তা এক শ্রমিককে মারধর করে। তাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে ওই শ্রমিক বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) সকালে কারখানায় এসে আবার চলে যায়। কিন্তু, আহত ওই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে কিছু শ্রমিক গুজর ছড়িয়ে পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তোলে। বৃহস্পতিবার তারা কারখানা এলাকায় বিক্ষোভ করে। তাদের সঙ্গে পাশের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরাও যোগ দেয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত শ্রমিকরা বিভিন্ন কারখানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর এবং ডেল্টা স্পিনিং মিলের আনসার সদস্যদের মারধর করে। এতে আনসারের একজন সদস্য নিহত ও তিন জন আহত হন।’
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাশিমপুরের হাতিমারা এলাকার মিতালী ফ্যাশন লিমিটেড পোশাক কারখানার কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর মেহেদী হাসানকে ১৫ পিস টিশার্ট চুরির অভিযোগে ২৯ অক্টোবর কারখানার কয়েক কর্মকর্তা মারধর করেন। এতে ওই শ্রমিক আহত হন। তাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তার মৃত্যু হয়েছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে ওই কারখানার শ্রমিকরা বুধবার (৩১ অক্টোবর) বিকালে বিক্ষোভ শুরু করে। এ ঘটনার জের ধরে বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিকরা কারখানায় এসে কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এসময় আশপাশের আরও কয়েক কারখানার শ্রমিকরা তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। একপর্যায়ে বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা ওই কারখানা এবং মুনটেক্স, মাল্টি ফ্যাব্রিক্স, ডেলটা কম্পোজিট, যমুনা গার্মেন্টস, তুসুকা ও কেয়া স্পিনিংসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি কারখানায় হামলা চালিয়ে দরজা ও জানালার কাঁচসহ বিভিন্ন মালামাল এবং গাড়ি ভাঙচুর শুরু করে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পাশের ডেল্টা স্পিনিং মিলে যায়। তারা গেট ভেঙ্গে ওই কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের বের করে তাদের সঙ্গে যোগ দিতে বললে আনসার সদস্যরা বাধা দেয়। এ সময় উত্তেজিত শ্রমিকরা আনসার সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করে। হামলাকারীরা কারখানার বিভিন্ন মালামালসহ কয়েকটি গাড়িও ভাঙচুর করে। শ্রমিকদের হামলায় কারখানার আনসার সদস্য ভৈরব চন্দ্র সরকার, সাজু মিয়া, আবুবকর, রহিজুল ইসলাম ও প্লাটুন কমান্ডার গিয়াস উদ্দিন মোল্লা আহত হন। অবস্থা বেগতিক দেখে আনসার সদস্যরা আত্মরক্ষোর্থে ১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে গুরুতর আহত আনসার সদস্য ভৈরব চন্দ্র সরকার ও সাজু মিয়াকে দুপুরে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ভৈরব চন্দ্র সরকারকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের মাথা, বুক, কপাল, হাত ও মুখসহ শরীরের বিভিন্নস্থানে জখমের চিহ্ন রয়েছে। আহত অন্য আনসার সদস্যদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ ও গাজীপুর মেট্টোপলিটন পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় ওই এলাকার বেশ কয়েকটি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিকালে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে শ্রমিক হত্যার গুজবে বিক্ষোভ, ১০ কারখানায় ভাঙচুর








