বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘মেগা প্রকল্প থেকে চুরি, বিদ্যুৎ চুরিসহ ব্যাংক-শেয়ারবাজার লুটপাট করতে করতে বর্তমান সরকার ভোট চুরিতেও ওস্তাদ হয়ে উঠেছে। তাদের এই ভোট চুরি ঠেকাতে হবে।’
শুক্রবার (২১ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে ৩টায় নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার সোনাকান্দা স্কুল মাঠে আয়োজিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনি জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তারা (সরকার) বলছে আগের রাতেই ব্যালটবাক্সে ভোট ভরে রাখবে। তাই তাদের ভোট চুরি ঠেকাতে আগের রাত থেকে প্রতিটি কেন্দ্রে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাহারা বসাতে হবে। এবার আর কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।’
পুলিশ, বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ), সেনাবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে আছেন। চাকরি বিধি অনুযায়ী নিরপেক্ষতার সাথে এ দায়িত্ব পালনে আপনারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আগামী ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আপনারা নিরপেক্ষ থাকবেন। আপনারা জনগণের পক্ষে অবস্থান নেবেন, জনগণের বিরুদ্ধে নয়।’
নির্বাচন কমিশনকে ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের কিছু বলার নেই, তারা অসহায়। আমরা যে কথা বলি, তারা অসহায়ের মতো চুপ করে বসে থাকে। নির্বাচন কমিশনকে বলি, সোজা হয়ে দাঁড়ান। সংবিধান, রাষ্ট্র আপনাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে তা সঠিকভাবে পালন করুন। নিরপেক্ষভাবে যাতে নির্বাচন হয়, জনগণ যাতে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে, সেই ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় পদত্যাগ করুন, না পারলে চলে যান। এদেশের মানুষ সেটা মেনে নেবে, কিন্তু কোনও অন্যায় মেনে নেবে না।’
নারায়ণগঞ্জে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘নির্বাচনের আর মাত্র ৬ দিন আছে, তবে ভয় পাবেন না। নারায়ণগঞ্জের বিপ্লবী মানুষকে সংগঠিত করুন। মানুষ তো একবারই মরে, দুই বার মরে না। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য বুক টান টান করে সোজা হয়ে দাঁড়ান।’
নারায়ণগঞ্জবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভোট দেওয়া আপনাদের হক, আদায় করে নেবেন। বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আপনাদের কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে বিজয় অর্জন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা অন্ধকারে থাকবো, নাকি আলোর পথে যাত্রা করবো। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা স্বৈরতন্ত্র-স্বৈরাচার-ফ্যাসিবাদের অধীনে থাকবো, নাকি গণতন্ত্রের দিকে যাবো। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা পরাধীন হয়ে থাকবো, নাকি স্বাধীনতার দিকে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘গত ১০ বছরে এই সরকার আমাদের অসংখ্য ভাইকে হত্যা করেছে, গুম করেছে, হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বিনাকারণে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে। সর্বশেষ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মাতা খালেদা জিয়াকে ১০ মাস ধরে অন্ধকার কারাগারে বন্দি করে রেখেছে। তিনি বন্দি অবস্থায় দিন গুনছেন, কবে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পতাকা উড়বে, স্বাধীনতার পতাকা উড়বে, আমরা তাকে বের করে আনবো।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে কারাগারে গিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে এসেছি। তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। হাঁটতে পারেন না। হুইল চেয়ারে চলতে হয় তাকে। কিন্তু তার মুখে কোনও মলিনতা দেখিনি। তিনি আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, তোমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকো, আন্দোলনের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রকে মুক্ত করো। তাহলেই আমার মুখে হাসি ফুটবে। মায়ের মুখের হাসির জন্য আমাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে ধানের শীষে ভোট দিতে হবে।’
নেতাকর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শত প্রতিকূলতার মাঝেও আপনারা আজ এই মাঠে সমবেত হয়েছেন। দেশমাতা খালেদা জিয়ার বার্তা শোনার জন্য এসেছেন। একটি ভয়াবহ মুহূর্ত আমরা কাটাচ্ছি। গোটা জাতির জন্য এই সময়টা গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘এক অদ্ভুত নির্বাচন হচ্ছে দেশে। নির্বাচন কমিশনার গতকাল বলেছেন, দেশে নাকি গণতন্ত্রের সুবাতাস বইছে। সুবাতাস কেমন? আমার ভাইয়েরা একটি নির্বাচনি জনসভায় আসতে পারে না। নির্বাচনি জনসভার পারমিশন নেওয়ার পরও মঞ্চ করতে পারে না। মাইক লাগাতে দেওয়া হয় না। রাস্তায় রাস্তায় নেতাকর্মীদের আটকে দেওয়া হয়। চমৎকার নির্বাচন হচ্ছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১৬ জন প্রার্থীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পরে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। জামিন দেওয়া হচ্ছে না। অথচ ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পর কোনও গ্রেফাতার হবে না। তাহলে এই প্রধানমন্ত্রীকে কি সত্যবাদী বলবো?’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বললেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে, একদল মঞ্চ করে হাজার হাজার নেতাকর্মী নিয়ে সমাবেশ করছে, হেলিকপ্টার নিয়ে পতাকা উড়িয়ে জনসভা করছে, আমাদের কোনও সভা করতে দেওয়া হয় না।’
তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ জেগে উঠছে, মানুষ যত বেশি জেগে উঠছে, সোচ্চার হচ্ছে, ততই এই সরকার আমাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন না হলেও তাদের (সরকার) উন্নয়ন হয়েছে। তাদের পকেট বোঝাই হয়েছে। বিদ্যুতের দাম দশ গুণ বেড়েছে, গ্যাস-পানির দাম বেড়েছে, বাড়িভাড়া ভাড়ছেই। চালের দাম বাড়ছে। বলেছিল, ১০ টাকা কেজিতে চাল খাওয়াবে, বিনামূল্যে সার দেবে। এখন চালের কেজি ৬০ টাকা, বিনামূল্যের সার কোথায়? সারাদেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে তারা বৈতরণী পার হয়ে যাবে। তারা বলেছিল, ঘরে ঘরে একজনকে চাকরি দেবে। কিন্তু চাকরি নাই। চাকরি আছে লাখ লাখ টাকা দিলে। তাও আবার ডিএনএ টেস্টে আওয়ামী লীগ হলে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ক্ষমতায় যেতে পারি, তবে যুবকদের জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে চাকরির ব্যবস্থা করবো। যতদিন চাকরির ব্যবস্থা করতে না পারবো, ততদিন বেকার ভাতা দেওয়া হবে। নারীশিক্ষার উন্নয়নের জন্য স্নাতক পর্যন্ত বিনাবেতনে পড়ার সুযোগ দেওয়া হবে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয়ে গঠন করে তাদের সমস্যার সমাধান করা হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করবো।’
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছিলাম গণতন্ত্রের জন্য। সেই গণতন্ত্র তারা উধাও করে দিয়েছে। এখন এক ব্যক্তির, এক দলের শাসন চলছে। নারায়ণগঞ্জের পাঁচ আসনে যাদের ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়েছে, আপনাদের মনে করতে হবে, তারা খালেদা জিয়ার প্রার্থী। সারাদেশে খালেদা জিয়া নির্বাচন করছেন। আপনি একটি ভোট দেবেন, খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন। এটা মনে করে মা-বোন, পাড়া-প্রবিবেশী সবাই ৩০ তারিখ সকালে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবেন। সেই দিন কোনও বাধা আমরা মানবো না; ভোট দিয়ে ভোট গণনা শেষে জয় নিয়ে কেন্দ্র ছাড়বো।’








