গত বছরের এই দিন বিবাহবার্ষিকী পালন করতে নেপালে যাওয়ার পথে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ডা. রেজা হাসান ও কামরুন নাহার বেলীর একমাত্র মেয়ে তাহিরা তানভীন শশী। তার মৃত্যুর পর থেকে শহরের পশ্চিম দাশড়া বাড়িজুড়ে বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা।
একমাত্র সন্তান শশীকে হারিয়ে কেমন আছে ওই পরিবারটি তা দেখতে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তিনতলা বাড়িটি প্রাণহীন। শশীর রুমের এক কোনায় বসে আছে তার মা কামরুন নাহার বেলী। তার দু’চোখ বেয়ে অঝোরে পানি ঝরছে। ঘরের আরেক কোনায় সোফায় বসে আছেন শশীর বাবা ডা. রেজা হাসান খান।
শশীর মা কামরুন নাহার বেলীকে মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। মিনিট পাঁচেক পর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালেন, তার প্রতিটি সেকেন্ড কাটে মেয়ে হারানোর যন্ত্রণায়। একমাত্র সন্তানকে ঘিরে তাদের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল তা নেপালেই শেষ হয়ে গেছে। শশীর সঙ্গে তার এতো স্মৃতি আছে, যা বলে শেষ করা যাবে না। প্রতিটি সময়, প্রতিটি সেকেন্ড শশীর স্মৃতি তাকে তাড়া করে বেড়ায়। ঘুম থেকে শুরু করে রাত অবধি যতক্ষণ শশী বাসায় থাকতো মনে হতো বাসাজুড়ে ফুটন্ত ফুলের সুভাস বইছে। সেই দিনগুলো আর জীবনে ফিরে আসবে না। মা বলে আর কেউ গলা জড়িয়ে ধরবে না। এখন সবই স্মৃতি।
শশীর বাবা ডা. রেজা বলেন, ‘জীবনের সবকিছু ছিল শশীর জন্য। শশী আজ না ফেরার দেশে চলে গেছে। সে একাকী আছে। আমরা দুজন এখন দুঃখের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। এটাই আমাদের নিয়তির লিখন।’ শশীর বাবা জানালেন, শশীর স্মৃতি ধরে রাখতে পারিবারিক উদ্যোগে নিজ বাড়ির আঙিনায় একটি তিনতলা মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। এখানে নিয়মিত নামাজ আদায়, কোরআন শিক্ষা ও হাফেজ তৈরি করা হবে।
এদিকে সে সময় বিমান দুর্ঘটনায় আহত শশীর স্বামী ডা. রেজাউনুল হক শাওন বিদেশ থেকে উন্নত চিকিৎসা নিয়েছেন। চোখে-মুখে ক্ষত নিয়ে বাড়ি ফিরলেও দুর্ঘটনার সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার আগে প্লেনটি চালকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে বারবার কাত হয়ে যাচ্ছিল। যাত্রীরা চিৎকার করছিল। ল্যান্ডিং করার সময় জোরে একটি ঝাঁকুনি দিয়ে আগুন ধরে যায়। তখন মনে হয়েছিল আমার সিটটি ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছে। পুরো প্লেন ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। এ সময় আমার চিৎকার করার মতো শক্তি ছিল না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমিনোলজিতে মাস্টার্স করা তাহিরা তানভীন শশীর ২০১১ সালে চাচাতো ভাই শাওনের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। ১৭ মার্চ ওই দম্পতির বিবাহবার্ষিকী ছিল। ২০১৮ সালের ১২ মার্চ সপ্তম বিবাহবার্ষিকী পালন করার জন্য নেপাল যাওয়ার পথে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনায় চারজন ক্রুসহ মোট ২৭ জন বাংলাদেশি নিহত হন।








