নারায়ণগঞ্জে এইচএসসি টেস্ট পরীক্ষায় দুইয়ের অধিক বিষয়ে ফেল করায় অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বন্দর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুক্লা সরকারের কাছে যান সুপারিশের জন্য। ছেলেমেয়েদের পাস করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান তারা। কিন্তু তাদের এই আবদারকে ‘অন্যায্য’ আখ্যায়িত করে সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে বলেছেন তিনি। ইউএনও তার ফেসবুক পোস্টে সবার শেষে লিখেছেন, ‘মাইরের ওপর ওষুধ নাই’।
এ নিয়ে নারায়ণগঞ্জে সমালোচনা শুরু হয়েছে। সরকার যেখানে স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের মারধরের বিপক্ষে, সেখানে ইএনও’র এই স্ট্যাটাস সরকারের বিপক্ষে অবস্থান বলে মনে করছেন নারায়ণগঞ্জের বিশিষ্টজনরা।
ইউএনও’র দেওয়া সেই স্ট্যাটাস হুবহু তুলে ধরা হলো-
গত কয়েকদিন ধরে বেশ কিছু অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রী আসছে। তারা সবাই এইচএসসি টেস্ট পরীক্ষায় দুইয়ের অধিক বিষয়ে অকৃতকার্য। তাদের আবদার, আমি যেন তাদের পাস করিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করি। তাদের জিজ্ঞেস করলাম, কেন তারা ফেল করলো? ছাত্রছাত্রীদের ভাষ্য- এই একটু সমস্যা ছিল। কী সমস্যা খোলাসা করে বলে না ।
বেশিরভাগ মা-বাবা বললো, তাদের সন্তানরা পরীক্ষার সময় অসুস্থ ছিল। অসুস্থতার ধরন জিজ্ঞেস করলে বলে, সবার জ্বর ছিল। কেউ কেউ বললো, কলেজের স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে নাই তাই ফেল করিয়েছে। কোনও কোনও মা বললো, তাদের সংসারে অশান্তি, ছেলে পড়তে পারেনি।
একজন ছাত্র বললো, প্রিন্সিপাল স্যার কলেজ ড্রেস ছাড়া কলেজে ঢুকতে দেয় না, চুলে আর্মি কাট দিতে বলে এবং খুব আশ্চর্য লাগলো ছেলের মাও একই বিষয়ে অভিযোগ করছে! জিজ্ঞেস করলাম এইচএসসি’র পূর্ণ রূপ কী? মাশাল্লাহ কেউই বলতে পারলো না।
এরমধ্যে আবার সরকারি স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পাওয়া ছেলেমেয়েদের বাবা-মা আছেন। আজ একজন বাবা তার মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পেরোনো ছেলের সামনে বলছেন, ম্যাডাম আমার ছেলে বলে দিছে সে যদি এই স্কুলে না ভর্তি হতে পারে তাহলে আর লেখাপড়াই করবে না! শাব্বাস বাপ-বেটা!
শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের উদ্দেশে সম্মান রেখেই বলছি, আপনাদের মনে কেন এত মায়া, মায়ার বশে আপনারা পরীক্ষার হলে বাচ্চাদের কথা বলতে দেন। তারা একজন আর একজনের দেখে লিখলেও আপনারা তা দেখেন না। এখনও কেন শুনতে হয়, এই চুপ কর, ম্যাজিস্ট্রেট আসছে। আপনারা মনে করেন বাচ্চাগুলা পাস করুক, ভালো কথা কিন্তু পরীক্ষার হলে সুযোগ দিয়ে কেন? কেন আপনাদের শুনতে হবে আপনাদের কাছে না পড়লে আপনারা ফেল করায়ে দেন। আপনারা কি ভাবেন, এতে করে বাচ্চাগুলার উপকার হচ্ছে, তারা আপনাদের মনে রাখবে? একটা সময়ে এরাই আপনাকে অসম্মান করবে, পাত্তাই দেবে না।
প্রিয় বাবা-মা, আপনি আপনার সন্তানের সামনে শিক্ষকের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, শিক্ষককে ছোট করছেন, আপনার সন্তান আর ক’দিন পর আপনাকে সম্মান করবে তো! সন্তান ফেল করলে/ চান্স না পেলে সব শিক্ষকের দোষ। প্রশ্ন কঠিন হয়েছে, প্রশ্নফাঁস হয়েছে, সিস্টেম ভালো না, টাকা খেয়েছে ব্লা ব্লা। কোনও শিক্ষকের কি এই সাধ্য আছে যে খাতায় লেখার পরও তাকে ফেল করায় দেয়! যে বাচ্চাটা ইংরেজিতে তিন/তের পেয়েছে তাকে কীভাবে তেত্রিশ করবে!
বাচ্চাকে শখ করে, আদরের আতিশয্যে, আধুনিকতার সংস্পর্শে আইফোন কিনে দিলেন, বাইক কিনে দিলেন। কিন্তু সে আদৌ স্কুলে/কলেজে যায় কিনা কয়দিন খোঁজ নিয়েছেন। সে কার সঙ্গে চলাফেরা করে খোঁজ নিয়েছেন শেষ কবে? কবে সে অন্য কাউকে খুব ছোট্ট কাজে ধন্যবাদ বলেছে? আচ্ছা সে কি কখনও তার স্কুলের দফতরিকে সালাম দিয়েছে? সে কি স্কুলের মাঠ যে ঝাড়ু দেয় তাকে থ্যাংকু বলেছে? সে যে রিকশায় আসা-যাওয়া করে তাকে কোনোদিন থ্যাংকু বলেছে?
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: মাইরের ওপর ওষুধ নাই!
স্ট্যাটাসের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শুক্লা সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মূলত ছেলেমেয়েদের অন্যায্য আবদার নিয়ে যেসব অভিভাবক আসেন তাদের উদ্দেশে লেখা হয়েছে স্ট্যাটাসটি। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন করতে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতে তারা নিয়মিত পাঠদান ও ছাত্র শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই আমার এই লেখা। তবে এটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত, সরকারি দফতরের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই।’
এদিকে ইউএনও’র এ ধরনের স্ট্যাটাস সরকারের বিপক্ষে অবস্থান বলে মনে করছেন নারায়ণগঞ্জের বিশিষ্টজনেরা।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, ছাত্রদের মারা নিষিদ্ধ। সরকার এর বিপক্ষে। ফলে তার কথা সরকারের নীতির বিপক্ষে। একজন ইউএনও এ কথা বলতে পারে না। বিষয়টি তদন্ত করে ইউএনও’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আব্দুর রহমান আরও বলেন, ‘আমাদের স্কুলগুলোকে শিক্ষকদের অবহেলা রয়েছে সেসব অস্বীকারের উপায় নেই। অভিভাবকদেরও সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে।’
এ ব্যাপারে কবি আরিফ বুলবুল বলেন, ‘সংবিধানে “মাইরের উপরে ওষুধ নাই” এমন কোনও কথা নেই। ইউএনও রাষ্ট্রের অংশ। তিনি এ কথা লিখতে পারেন না। বাচ্চাদের মারায় অনেক শিক্ষকের শাস্তিও হয়েছে। সেখানে ইউএনও শিশুদের মারার পক্ষে কীভাবে কথা বলেন আমি জানি না।’








