সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ফুটপাতে চাঁদাবাজি করার অভিযোগে ২০১৯ সালে ২৯ অক্টোবর গ্রেফতার হন দিলখুশাবাগ এলাকার কথিত ছাত্রলীগ নেতা। বেশ কিছুদিন জেলও খাটেন তিনি । তার বছর দেড়েক পর ওই কথিত ছাত্রলীগ নেতা এখন যুবলীগ নেতা হয়ে থানার ওসির (তদন্ত) কক্ষে কেটেছেন জন্মদিনের কেক, তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এই ওসিসহ আরেক পুলিশ কর্মকর্তা! থানার ভেতরে জন্মদিন পালনের এই ছবি ওই কথিত নেতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করলে তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। প্রশ্ন ওঠে, চাঁদাবাজি মামলার আসামির জন্মদিন কী করে থানায় উদযাপিত হয়!
কথিত ছাত্রলীগ নেতার নাম রিপন সরদার ওরফে রায়হান ইসলাম । তিনি সাভারের দিলখুশাবাগ এলাকার মো. গুলজারের ছেলে। নিজের ফেসবুক ওয়ালে নিজেকে ৭ নং ওয়ার্ড শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি দাবি করেছেন তিনি। যদিও স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতাদের দাবি, রিপন ছাত্রলীগের কেউ নয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবি ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রবিবার রাতে সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সাইফুল ইসলামের কক্ষে কেক কেটে জন্মদিন পালন করেন রিপন। আর থানার ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার দুই শীর্ষ কর্মকর্তা চাঁদাবাজি মামলার এই আসামি ও তার সঙ্গে আসা অতিথিদের জানিয়েছেন অভ্যর্থনা।
ছবিতে দেখা যায়, দুই কর্মকর্তার মধ্যমনিহয়ে রায়হান তাদের হাতে হাত রেখে কেটেছেন নিজের জন্মদিনের কেক। পরে রায়হানের ফুলের শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন সাভার মডেল থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সাইফুল ইসলাম। আরেক ইন্সপেক্টর (অপারেশনস) আল আমিন তালুকদার রায়হানকে কেক মুখে তুলে খাইয়েছেন।
তবে ফেসবুকে আপলোড করা থানার ছবির নিচে তিনি লিখেছেন এটি নিজের বাসায় তোলা ছবি।
রবিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে রায়হান ইসলাম তার নিজ নামের একটি ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেন এমন কিছু ছবি । এরপর থেকেই তা ভাইরাল হয়ে যায় । এসব ছবি নিয়ে স্যোশাল মাধ্যমে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। পহেলা ফাল্গুনের দিনে ১৪ ফেব্রুয়ারি সাভার থানায় স্থানীয়ভাবে সুপরিচিত ওই যুবকের ঘটা করে জন্মদিন পালন করা নিয়ে এখন তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে সাভার মডেল থানা পুলিশ। বিরূপ মন্তব্য করেছেন নেটিজেনরা। যদিও পরবর্তীতে স্ট্যাটাসটি রায়হান ইসলামের আইডি থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।
জানা গেছে, কখনও ছাত্রলীগ নেতা আবার কখনও কর্মী পরিচয়দানকারী রায়হান মূলত ফুটপাতে চাঁদাবাজি মামলার আসামি। রিপন সরদার রায়হান নামে এই যুবক নিজেকে কখনও পরিচয় দেন ছাত্রলীগ নেতা আবার কখনও কর্মী হিসেবে। তবে বাস্তবে উপজেলা ছাত্রলীগের কোনও কমিটিতেই তার কোনও পদ নেই বলে পরে জানিয়েছেন তিনি নিজেই। তার নামে যে মামলা রয়েছে সে বিষয়টিও স্বীকার করেছেন গোপনে এক কথোপকথনে।
তবে রিপন সরদার ওরফে রায়হান ইসলামের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে জানা নেই বলে জানিয়েছেন জন্মদিন উদযাপনকারী থানার দুই ইন্সপেক্টর।
থানায় জন্মদিন পালনের বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করেন রিপন সরদার। পরে স্বীকার করে বলেন, আমার সাথে একটা মানুষের সম্পর্ক থাকলে তার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারি। এখন এটা যদি আপনারা সমালোচনার দিকে নেন তাহলে ওটা ওইভাবেই হবে।
দলীয় কোনও পোস্ট আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘বর্তমানে আমার কোন পদ নেই । আমি ছাত্রলীগের একজন কর্মী ছিলাম। এখন আমি ৭ নং ওয়ার্ডের যুবলীগের সভাপতি প্রার্থী।’
২০১৯ সালে পূর্ব শত্রুতার জেরে তার বিরুদ্ধে এই চাঁদাবাজির মামলা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সাভার মডেল থানার ইন্সপেক্টর (অপারেশন্স) আল আমিন তালুকদার তাদের থানায় রিপনের জন্মদিনের কেক কাটার কথা স্বীকার করেন ।
সাভার মডেল থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘একটা মানুষ যদি কেক নিয়ে এসে বলে, ভাই আমার জন্মদিন, কেকটা একটু কেটে দেন। তখন আর কী করা! এছাড়াও আরও দুই তিনজন সুপারিশও করেছে । এর জন্যই মানবতা দেখাতে গিয়ে এটি করা হয়েছে। তবে ছবি তুলে ফেসবুকে দেওয়ার বিষয়টি জানলে পরিচিত হলেও আমি দিতাম না।’
সাভার প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুস সাকিব বলেন, থানা হচ্ছে মানুষের ভরসার জায়গা। এখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয় দেখা হয়। এটি কারও জন্মদিন পালন আর হাসি তামাশা করার জায়গা না। মূলত নিজের প্রভাব জাহির করতেই ওই ব্যক্তি থানায় কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ব্যক্তি জানান, ‘ফুটপাতে চাঁদাবাজি করে ছাত্রলীগের এই কথিত নেতা। এই চাঁদাবাজি ঠিক রাখা এবং এখন একটি ওয়ার্ডে যুবলীগের সভাপতি পদে নির্বাচন করার বিষয়টিকে সামনে রেখেই প্রভাব বিস্তার করতেই থানায় ঢুকে পুলিশের দুই কর্মকর্তার সঙ্গে কেট কেটেছে সে। এই ছবি ফেসবুকে আপলোড করার উদ্দেশ্য ছিল সবাইকে দেখানো যে পুলিশের সঙ্গে তার ভীষণ সখ্যতা। তার পাতা ফাঁদে পা ফেলেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। যদি পুলিশ কর্মকর্তারা জেনে এ কাজ করে থাকেন তাহলে এটা অপরাধ আর যদি না জেনে করে থাকেন তাহলেও বিবেচনায় নিতে হবে থানা কোনও বিতর্কিত নেতার বা আসামির কেক কাটার জায়গা কিনা। অন্যের পাতা ফাঁদে পা ফেলে তারা অযথাই সমালোচিত হলেন। এটা স্রেফ পুলিশ কর্মকর্তাদের বুদ্ধির ভুল।’
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ-হিল কাফি বলেন, বিষয়টি মোটেও ঠিক হয়নি । থানার ওই দুই কর্মকর্তাকে সতর্ক করা হয়েছে। কারো সঙ্গে ছবি তুলতে হলে দেখে শুনে ভেবে তোলা উচিত।









