নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকায় জাতীয় হট লাইন ৩৩৩-এ খাদ্য সহায়তা চেয়ে উল্টো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে শাস্তি পাওয়া নিম্নবিত্ত ফরিদ আহমেদ মানসিকভাবে মুষড়ে পড়েছেন। আগের মতো ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। নীরব নিস্তব্ধ ফরিদ কিছুক্ষণ পর পর মাথায় হাত দিয়ে কী যেন চিন্তা করছেন। বলছেন, ‘লোক লজ্জার ভয়ে প্রকাশ্যে মানুষের কাছে খাদ্য সহায়তা চাইতে না পেরে গোপন রাখতে হট লাইন ৩৩৩-এ কল করে কী হতে যেন কী হয়ে গেলো।’
শাস্তি পাওয়া ফরিদ আহমেদ বলেন, আমার আত্মীয়-স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, যে কারখানায় কাজ করি তারা সবাই বলছেন কীভাবে এই কাজ আমি করেছি। আমি মসজিদে গেলে সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন আমি বড় অপরাধ করে ফেলছি।’ এই কথা বলেই চোখ মুছতে থাকেন তিনি। তিনি বলেন, এই ঘটনার পর থেকে বেশ চাপে আছি। স্থানীয় প্রশাসনের ব্যক্তিরা নানাভাবে চাপ দিচ্ছেন এ বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলার জন্য।
ফরিদ আহমেদ আরও বলেন, আমি যে টাকা খাদ্যসামগ্রী বিতরণে খরচ করেছি তা পেয়েছি। তাই এখন আর আমার কারও উপর কোনও রাগ বা ক্ষোভ নেই। আমার কপালে কষ্ট লেখা ছিলো তা পেয়েছি।
ফরিদ আহমেদের স্ত্রী হিরন বেগম দাবি করেন, ‘তার স্বামী গুছিয়ে কথা বলতে পারেন না। ব্রেন স্ট্রোক করার কারণে মানসিকভাবে অসুস্থ। ভুল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা করেছেন নাকি আমার স্বামী করেছেন তা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন।’
তিনি বলেন, একজন অসহায় গরীব মানুষে ওপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরার এমন অমানবিক শাস্তির বিষয়টি মেনে নিতে পারছেনা স্থানীয় এলাকাবাসীও। তারা বলেছেন, উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার উচিত ছিলো ফরিদ আহমেদ সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়ার। একজন স্থানীয় ইউপি মেম্বারের ওপর নির্ভর করে এমন শাস্তি দেওয়া মোটেই উচিত হয়নি। এই শাস্তির কারণে তিনি যে সামাজিক ও মানসিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সে ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাসান জানান, ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিরা ক্ষতিপূরণ দিতে না এসে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে টাকা দেওয়া প্রশাসনের আরেকটি ভুল বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
রাসেল আহমেদ নামের আরেক বাসিন্দা জানান, ফরিদ আহমেদ যেভাবেই হোক টাকা পেয়েছেন। কিন্তু তিনি যে সামাজিক ও মানুষিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সেই ক্ষতি কি কেউ পূরণ করতে পারবে? তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসন যেন ভবিষ্যতে এমন অমানবিক কাজ না করে সেই ব্যাপারে সর্তক হওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে ঘটনার তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ শামীম ব্যাপারী জানান, নির্ধারিত সময়ে মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে দাখিল করা হবে। তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরা দ্বারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়নি। ফরিদ আহমেদের বিষয়ে তথ্য পেয়েছেন তিনি চার তলা ভবনের মালিক। তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে অনুরোধ করেছেন সরকারিভাবে যেমন আমরা মানুষকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করি, অনুরূপভাবে তিনি যেন ১শ’ প্যাকেট খাদ্য সহায়তা প্রদান করেন। তিনি সেটা দিতে রাজি হয়েছেন।’
অন্যদিকে গত রোববার প্রশাসনের অনুরোধে স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটির প্রধান ব্যবসায়ী শাহনুর আলম শাস্তি পাওয়া ফরিদ আহমেদ ও তার স্ত্রী হিরন বেগমকে বাসায় ডেকে এনে একটি মুচলেকাপত্রে লিখিত রেখে হাতে ৬০ হাজার টাকা তুলে দেন। শাহনুর আলম দাবি করেন, তিরি তার নিজস্ব তহবিল থেকে এই টাকা অনুদান দিয়েছেন।
ফরিদ আহমেদ জানান, শাহনুর আলম একটি কাগজে মুচলেকা নিয়ে নগদ ৬০ হাজার টাকা দেন। কাগজে লেখা ছিলো আমি নিজে ভুল তথ্য উপস্থাপনের জন্য এই শাস্তি পেয়েছি। তবে শাহনুর আলম মুচলেকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
উল্লেখ্য, ১৮ মে নগরীর পশ্চিম দেওভোগ নাগবাড়ি এলাকার ফরিদ আহমেদ জাতীয় হট লাইন ৩৩৩-এ কল করে খাদ্য সহায়তা চান। উপজেলা প্রশাসন থেকে বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় ইউপি সদস্য আয়ুব আলী ফরিদ আহমেদকে বাসায় এসে বলেন আপনি এই খাদ্য সহযোগিতা পাওয়ার উপযুক্ত নন। এ ছাড়া তাকে নানাভাবে ধমকান। এর কিছুক্ষণ পরেই সেখানে গিয়ে হাজির হন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরা। এসময় ইউপি মেম্বার তাকে শিখিয়ে নিয়ে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে। বৃহস্পতিবার (১৯ মে) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরেজমিনে ওই বাড়িতে যান। এসময় ফরিদ আহমেদকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনি কি এই চারতলা বাড়ির মালিক?’। সে স্বীকার করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরকারি কাজের সময় নষ্ট করায় শাস্তি হিসেবে গরীব ১০০ জনকে ১শ’ প্যাকেট খাদ্য সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন এবং দু’দিনের সময় বেঁধে দিয়ে আসেন। ২১ মে শনিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজে গিয়ে সেই খাদ্য সহায়তা গরীব মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন।
ওই চার তলা বাড়িটি ফরিদ আহমেদের পৈতৃক সম্পত্তি। তারা ৬ ভাই এবং এক বোন উত্তরাধিকারী সূত্রে এই বাড়ির মালিক। ফরিদ আহমেদ তিন তলার ওপর ছাদে টিনশডে দুটি রুম ও নিচ তলায় একটি রুম পেয়েছেন। অন্যগুলো বাকি পাঁচভাই বসবাস করেন।









