দুই রাতের ব্যবধানে ১০ মামলা, ভঙ্গের পথে শতাধিক শিক্ষকের স্বপ্ন

নাদিম হোসেন, সাভার
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:২৪আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:২৭

সম্মিলিতভাবে পরিকল্পিত একটি নগর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার দেড় শতাধিক ব্যক্তি। সেই লক্ষ্যেই ধামরাইয়ের মাখালিয়া এলাকায় কয়েক শ’ একর জমি কেনা হয়। নাম দেওয়া হয় আকসির নগর প্রকল্প। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির অপতৎপরতায় তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পথে। ওই জমি নিজেদের দাবি করে মিথ্যা মামলা করেছেন ওই ব্যক্তিরা।

জানা গেছে, এই প্রকল্পের কাছে জমি বিক্রি করা ব্যক্তিদের অনেকেই ছিলেন বেকার। তাই গ্রামের চারশ’ লোককে নিয়ে সমিতি করে এর সদস্যদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রকল্পের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় বালু ফেলে জমি ভরাটের কাজ। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এতে স্থানীয় বাসিন্দা বদু, সাইদুর এবং তাদের লোকজন বাধা দেন। তারা গ্রামের লোকজনকে বাদ দিয়ে ঠিকাদার হিসেবে তাদের নেওয়ার দাবি জানান। তবে আকসির নগর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তাতে রাজি না হওয়ায় ঘটে বিপত্তি। ঠিকাদারি না পেয়ে প্রকল্পের জমি নিজেদের দাবি করে দেওয়া হয় মামলা। মাত্র দুই রাতের ব্যবধানে আকসির নগর প্রকল্পের বিরুদ্ধে করা হয় দশটি মামলা। তাড়াহুড়া করে দায়ের করা সব মামলায় আসামি করা হয়েছে ওই কোম্পানির প্রধান কর্মকর্তাসহ মোট ১১ জনকে।

দশটি মামলার মধ্যে দুটির অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মালিকানা দাবি করে দায়ের করা মামলার জমি প্রকৃতপক্ষে বংশী নদীর সরকারি খাস জমি। কিন্তু বিভিন্ন সরকারি দফতরে বাদীপক্ষ অভিযোগ করেছেন, তাদের জমি আকসির নগর দখল করেছে। তবে দাবি করা জমির অবস্থান ওই প্রকল্পের বাইরে, প্রায় এক মাইল দূরে।

গত ৪ আগস্ট ধামরাই থানায় প্রকল্পের প্রধান কর্মকর্তাসহ মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন ঢাকার ধামরাইয়ের কুল্লা ইউনিয়নের মাখুলিয়া গ্রামের বৃদ্ধা সাম দাসী। তার একদিন পরেই (৫ আগস্ট) আরেকটি লিখিত অভিযোগ দেন তার ছেলে ভজন রায়। দুটি ঘটনায়ই মামলা রুজু করে ধামরাই থানা। এছাড়াও একই নদীর জমির মালিকানা দাবি করে মাখুলিয়া গ্রামের রহমত আলীর ছেলে হজরত আলী আরেকটি মামলা (নং-২৬) করেন কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

লিখিত অভিযোগে সাম দাসী লেখেন, ‘আমি ও আমার ছেলে ভজন রায় ওয়ারিশ সূত্রে ধামরাই থানাধীন গোয়ালদী (মাখুলিয়া) মৌজায় ৬০ শতাংশ জমি ভোগ-দখল করে আসছি। কিন্তু আমরা নিরীহ, সংখ্যালঘু হওয়ায় আসামিরা আমাদের জমি দখল চেষ্টা করে।’

তবে অভিযোগে তিনি জমির কোনও তথ্য উল্লেখ করেননি। অভিযোগে উল্লিখিত মৌজার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধামরাই থানা এলাকায় গোয়ালদী নামে ওই মৌজায় কোনও ব্যক্তি মালিকানা জমি নেই। সাভারের ওই মৌজার শেষ অংশ বংশী নদী। এরপরেই শুরু ধামরাই ভূমি এলাকা।

অপরদিকে, ভজন রায় অভিযোগে লেখেন, ‘ধামরাই থানাধীন গোয়ালদি (মাখুলিয়া) মৌজায় ওয়ারিশ সূত্রে ১, ২ ও ৩নং দাগে ২৬৬ শতাংশ জমির মালিক হই আমি। সেখানেই ফসলাদি চাষ করে খেতাম। কিন্তু আসামিরা আমার জমিতে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাট করে দখলের চেষ্টা করেন।’

তবে উপজেলা ভূমি অফিস থেকে ওই জমির খতিয়ান, পর্চা, আরএস ম্যাপসহ সব কাগজপত্রে গোয়ালদী মৌজার ১নং খতিয়ানে ১, ২, ৩নং দাগের জমির মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ডেপুটি কমিশনারের। জমির আরএস ম্যাপে দেখা মেলে একই তথ্যের। সেখানে ওই জমির মালিক ছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ডেপুটি কমিশনার। গোয়ালদী মৌজার ১, ২ ও ৩ নং নামে যে জমি রয়েছে তা বংশী নদীর স্রোতের নিচে। এর মধ্যে ১নং দাগটি মাখুলিয়া ঘাট সংলগ্ন নদীর জেগে থাকা পাড়। যেটি আকসির নগর প্রকল্পের মূল ফটক থেকে প্রায় এক মাইল দূরে।

এ ছাড়া ৩ এবং ৯নং আরএস খতিয়ানের কাগজপত্রেও সামদাসী ও ভজন রায়ের দাবি করা মালিকানার সঙ্গে কোনও মিল নেই। একইরকম তথ্য দিয়ে করা হয়েছে অন্য মামলাগুলোও।

বড়কুশিয়ারা ও  বাড়ীগাঁওসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসির হোসেন জানান, বদুর নেতৃত্বে তার ছেলে ভজন রায়, সাইদুর, নজরুল, মনসুর ও পলানসহ আরও আট-দশ জনের একটি চিহ্নিত চক্র রয়েছে এই এলাকায়। তারা মূলত সরকারি জমি দখল করে দীর্ঘদিন যাবৎ ভোগদখল করে আসছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য বাবুল হোসেন বলেন, ‘বৃদ্ধা সাম দাসীর মিথ্যা অভিযোগ করার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তার ছেলে ভজন রায় বদুকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন খাস জমি দখল করে মাটি বিক্রি করে। এ বিষয়ে কেউ কথা বললে ভজন দলবল নিয়ে হামলা চালায়।’

এ বিষয়ে আকসির নগর প্রকল্প ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম সোহাগ বলেন, ‘সরকারি বংশী নদীর জমি মালিকানা দেখিয়ে একসঙ্গে তিনটি মামলা করা হয়েছে । এছাড়াও ওইসব জমি আমাদের প্রকল্প থেকে এক কিলোমিটার দূরে। বদু ও সাইদুরকে বালুর ঠিকাদারি না দেওয়ায় তারা পুলিশকে ভুল বুঝিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলাগুলো দায়ের করেছেন। মাত্র দুই রাতে মোট ১০ মামলা দায়ের করার বিষয়টি স্পষ্ট প্রতিহিংসা। এতে এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বপ্ন ধ্বংসের পথে।’ সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জনান তিনি।

এদিকে নদীর পাড়ের ওই জমিতে কোনও বালু ফেলা হয়নি, তবে ফেলার চেষ্টা চলছে বলে জানান বৃদ্ধা সাম দাসীর ছেলে ভজন রায়। তিনি বলেন, ‘আমার জমি নদীর পাড়েই। তারা এখনও জমিতে বালু ফেলেনি। কিন্তু ওইটা দখলের ব্যবস্থা করে রাখছে।’ জমিটি খাস কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, ওইটা খাস জমি। আমরা তিন পুরুষ ধরে ওই জমি ভোগ করে আসছি।’

এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী বলেন, ‘মামলা যে-কেউই করতে পারে। তাতে সরকারি জমি তার হয়ে যাবে না। তবে এই জমির বিষয়টি আমি জানি না। রেকর্ড দেখে বলতে পারবো।’

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ সরদার  বলেন, ‘ওই বৃদ্ধাসহ গ্রামের লোকজন আমার কার্যালয়ে এসেছিলেন। থানায় যে-কেউই মামলা করতে পারেন। পুলিশের কাজ সেসব তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া। আমরা সেটাই করবো।’

 

/এমএএ/
সম্পর্কিত
নিজের দেশে আমি কেন এমন অপমানের শিকার হলাম
তিন দিনে সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীতে ঢুকেছে ৫ লাখের বেশি চামড়া
সাভার ট্যানারিতে ঢুকেছে ৫ লাখ কাঁচা চামড়া
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম