রাজধানীর উড়াল সেতুতে দুর্ঘটনায় নিহত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইশা মমতাজ মীমের গ্রামের বাড়িতে এখন শুধু শোকের মাতম। মেয়ের শোকে কাতর মা-বাবার বিলাপ থামছে না। বাড়িতে ভিড় করেছেন পাড়া-প্রতিবেশী ও সহপাঠীরা। বাড়িভর্তি মানুষের মনও শোকের আবরণে ঢাকা।
শনিবার (২ এপ্রিল) সকাল থেকেই গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক এলাকায় মাইশার বাড়িতে স্বজন, প্রতিবেশী ও সহপাঠীরা ভিড় জমিয়েছেন। সবার মুখ থেকে মাইশার স্মৃতি অঝোরে ঝরছে।
এর আগে, শুক্রবার (১ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকার উড়াল সেতুতে দুর্ঘটনায় নিহত হন মাইশা। তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। উত্তরার বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন। এ সময় খিলক্ষেত উড়াল সড়ক দিয়ে ৩০০ ফুট যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন।
মাইশার বাবা নূর মোহাম্মদ বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘মাগো তোমাকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। এরকমভাবে চলে যাবে কল্পনাতেও ছিল না। তোমাকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন আমি বাস্তবায়ন করতে চাই। তুমি চলে এসো মা।’
মাইশার বাড়িতে আসা প্রতিবেশীরা তার মা আছিয়া খাতুনকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে কোনও কিছুই তার মেয়ে হারানোর শোকে প্রলেপ দিতে পারছে না।
স্বজনরা জানান, পরিবারের বড় মেয়ে মাইশা। তার বাবা কালিয়াকৈরের মৌচাক এলাকায় আইডিয়াল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখান থেকেই মাইশা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে উচ্চ শিক্ষার জন্য নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
সহপাঠী বর্তমানে গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রাজিউন নবী বলেন, ‘খুব ভালো মেয়ে ছিল। মাধ্যমিকে পড়ার সময় বুঝতে পারিনি, এটি তার বাবার প্রতিষ্ঠিত স্কুল। নিরহংকার একটি মানুষ ছিল সে।’
স্কুলশিক্ষক আবুল কালাম বলেন, ‘মাইশা বিনয়ী এবং মেধাবী ছিল। তার ছোট বোনও ভালো ছাত্রী। সমানতালে পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল।’
মৌচাক আইডিয়াল স্কুলের কনফেকশনারি স্টোরের মালিক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভদ্র ও বিনয়ী বলতে যা বোঝায় মেয়েটি সেরকম ছিল। তার জন্য আমাদেরও আফসোস হয়। এমন একটি মেয়ে এভাবে চলে গেলো ভাবতেই কষ্ট হয়। আমরা এমন মৃত্যু চাই না। আমিও একজন বাবা, আমরা স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।’
প্রতিবেশী বায়েজীদ হোসেন বলেন, ‘মাইশা আমাদের চোখের সামনে ছুটোছুটি-দৌড়ঝাঁপ করেছে, বড় হয়েছে। এমনভাবে সন্তান মারা গেলে কোনও বাবা-মা সাহস করবে না তার সন্তানকে চোখের আড়ালে দিতে। আমাদের দেশে কবে সেই দিন হবে, যেদিন সন্তানকে শিক্ষার জন্য বাড়ির বাইরে বের করে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকতে হবে না?’
প্রতিবেশী নাজমুল সৈকত বলেন, ‘মাইশা মূলত স্কুটি চালিয়ে উড়াল সড়কের এক পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় পেছন থেকে একটি কাভার্ডভ্যান পেছনে ধাক্কা দেয়। সে ছিটকে পড়ে কাভার্ডভ্যানের চাকার নিচে চাপা পড়ে। মুহূর্তেই কাভার্ডভ্যানটি পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ এসে তার লাশ উদ্ধার।’









